হাওর থেকে পুলিশের জব্দ করা নিষিদ্ধ ‘খনা জাল’ ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা আদর্শনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ১,১৬৫ জন জেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত এই মামলায় ৬৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১,১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। একসঙ্গে সহস্রাধিক জেলের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় পুরো হাওরাঞ্চলে ব্যাপক চাঞ্চল্য, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, গত ১১ জুলাই শনিবার বিকেলে আদর্শনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সদস্যরা ডিঙ্গাপোতা হাওরে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ফিট দৈর্ঘ্যের চারটি নিষিদ্ধ খনা জাল এবং ইঞ্জিনচালিত দুটি নৌকা জব্দ করে তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, পরদিন রবিবার দুপুরে হাওরপাড়ের বিভিন্ন গ্রামের কয়েকশ জেলে সংঘবদ্ধভাবে তদন্ত কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে জব্দ করা জাল ও নৌকা ছিনিয়ে নিয়ে যান।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আদর্শনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই রাসেল পারভেজ বাদী হয়ে গত ১৩ জুলাই সোমবার রাতে মোহনগঞ্জ থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলার পর অভিযান চালিয়ে ৪ নম্বর মাঘান-সিয়াধার ইউনিয়নের কুড়েরপাড় গ্রামের জাকির হোসেন (২২) ও মামুন মিয়া (২৪) নামে দুই অভিযুক্ত জেলেকে গ্রেফতার করে গতকাল ১৪ জুলাই মঙ্গলবার আদালতে প্রেরণ করেছে পুলিশ।
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা:
স্থানীয়দের মতে, এমনিতেই অতিবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়ায় হাওরাঞ্চলের মানুষ চরম অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। তার ওপর বর্ষা মৌসুমে হাওরের ভাসমান জলে মাছ ধরতে বাধা এবং একসঙ্গে সহস্রাধিক জেলের বিরুদ্ধে এই মামলা যেন হাওরবাসীর জন্য “মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা” হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রেফতার আতঙ্কে এখন পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে অনেক গ্রাম।
কেন এই টানাপোড়েন?
সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগে মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর হাওরে ৭৫ হাজার মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। পোনাগুলো বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকার জন্য জেলেদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবে স্থানীয় জেলেদের দাবি, সরকারি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ গত ২৮ জুন শেষ হওয়ায় তারা এখন বৈধভাবে মাছ ধরার অধিকার ফিরে পেয়েছেন। তাই স্থানীয়ভাবে আরোপিত অতিরিক্ত এই নিষেধাজ্ঞা মানতে তারা অনাগ্রহী। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার জেলেদের সঙ্গে বৈঠক করলেও কোনো সমাধান আসেনি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাওরের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিস্তার নিশ্চিত করতে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে এই কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের পাশাপাশি হাজার হাজার অসহায় জেলের জীবিকা ও মানবিক বাস্তবতাকেও প্রাধান্য দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।