ভারতের রাজনীতিতে নেহরু-গান্ধী পরিবারের প্রভাব দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, হত্যাকাণ্ড, বিমান দুর্ঘটনা এবং পারিবারিক বিভাজন, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এই পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস।
সময়ের পরিক্রমায় একই পরিবারের এক শাখা কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছে, অন্য শাখা যুক্ত হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে। ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে এই পরিবার হয়ে উঠেছে উত্তরাধিকার, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক আদর্শের এক আলোচিত উদাহরণ।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালের ২৭ মে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর স্ত্রী কমলা নেহরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরা গান্ধী পরবর্তী সময়ে ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।
১৯৬৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৮০ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ফেরেন তিনি। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি এবং ১৯৮৪ সালের অপারেশন ব্লু-স্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে।
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর দিল্লিতে নিজের দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা গান্ধী। অপারেশন ব্লু-স্টারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ক্ষোভ তাঁর হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইন্দিরা গান্ধীর ছোট ছেলে সঞ্জয় গান্ধী জরুরি অবস্থার সময় ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেন। যদিও তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি, তবু সে সময় ক্ষমতাকেন্দ্রে তাঁর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা ছিল।
১৯৮০ সালের ২৩ জুন দিল্লিতে বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যু হয়। তাঁর স্ত্রী মানেকা গান্ধী ও ছেলে বরুণ গান্ধী পরবর্তী সময়ে নেহরু-গান্ধী পরিবারের মূল রাজনৈতিক ধারার বাইরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন।
ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মানেকার সম্পর্কের অবনতি এবং তাঁদের আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনা ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত। পরবর্তী সময়ে মানেকা গান্ধী বিজেপিতে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ছেলে বরুণ গান্ধীও বিজেপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে একাধিকবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বরুণ গান্ধীকে প্রার্থী করেনি। অন্যদিকে, মানেকা গান্ধী সুলতানপুর আসন থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলেও জয়ী হতে পারেননি। ফলে মা-ছেলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়।
সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যুর পর রাজীব গান্ধী ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তাঁর সরকার ক্ষমতায় ছিল।
রাজনীতিতে আসার আগে রাজীব গান্ধী বিমানচালক হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও আধুনিকায়ন নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে বোফর্স দুর্নীতির অভিযোগও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরাম্বুদুরে নির্বাচনী প্রচারের সময় আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন রাজীব গান্ধী। হামলাটির সঙ্গে শ্রীলঙ্কার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) সংশ্লিষ্টতা ছিল।
রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী ১৯৯০-এর দশকে কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৯৮ সালে তিনি দলের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় সেই দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের (ইউপিএ) চেয়ারপারসন হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০২৪ সালে তিনি রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
রাজীব ও সোনিয়া গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধী ২০০৪ সালে প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কংগ্রেসের সহসভাপতি ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি দলের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
২০২২ সালে শুরু হওয়া ভারত জোড়ো যাত্রা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাহুল গান্ধী বিরোধী রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় আসেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর তিনি লোকসভার বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে কংগ্রেসের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাও কংগ্রেসের সক্রিয় নেতা। দীর্ঘ সময় নির্বাচনী প্রচার ও দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার পর ২০২৪ সালে তিনি প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কেরালার ওয়ানাড আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি সংসদে প্রবেশ করেন।
রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কংগ্রেসের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক শক্তি এবং নির্বাচনী সম্ভাবনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তবে গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বের ওপর নির্ভরতা নিয়ে দলটির ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
সঞ্জয় গান্ধীর স্ত্রী মানেকা গান্ধী এবং ছেলে বরুণ গান্ধী বিজেপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মানেকা বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বরুণও একাধিকবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে বরুণ গান্ধী বিভিন্ন সময়ে বেকারত্ব, কৃষক ও সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে নিজের দলের সরকারের সমালোচনা করেছেন। এসব বক্তব্যের কারণে তাঁকে বিজেপির নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা একজন নেতা হিসেবে দেখা হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে মনোনয়ন না পাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট ভিত্তি নেই। ভারতীয় রাজনীতিতে দলীয় অবস্থান ও নেতৃত্বের সমীকরণ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
নেহরু-গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, পারিবারিক সম্পর্ক এক হলেও রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। রাজীব-সোনিয়া শাখা কংগ্রেসের নেতৃত্বের কেন্দ্রে রয়েছে। অন্যদিকে, সঞ্জয়-মানেকা শাখা বিজেপির রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
কংগ্রেস সাধারণত ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির কথা বলে। অন্যদিকে, বিজেপির রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদ ও জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই দুই রাজনৈতিক ধারার পার্থক্য ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কেরও অংশ।
তবে দুই পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক অবস্থানকে শুধু পারিবারিক বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, দলীয় কৌশল, নির্বাচনী বাস্তবতা এবং আদর্শিক অবস্থানও তাঁদের রাজনৈতিক পথ নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।
কংগ্রেসের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং নির্বাচনী সমর্থন ধরে রাখা। রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দলের পরিচিত মুখ হলেও তাঁদের রাজনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে জনসমর্থন, দলীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ফলাফলের ওপর।
অন্যদিকে, মানেকা ও বরুণ গান্ধীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।
নেহরু-গান্ধী পরিবারের ইতিহাস শুধু একটি পরিবারের উত্থান-পতনের কাহিনি নয়। এটি স্বাধীন ভারতের ক্ষমতার রাজনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, দলীয় উত্তরাধিকার এবং রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি।
মোতিলাল নেহরুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে জওহরলাল, ইন্দিরা, রাজীব হয়ে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা পর্যন্ত বিস্তৃত এই ইতিহাসে রয়েছে ক্ষমতা, ত্যাগ, বিতর্ক, ট্র্যাজেডি এবং রাজনৈতিক পুনরুত্থানের নানা অধ্যায়।
আর একই পরিবারের দুই শাখার ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান ভারতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে: রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কি আদর্শ নির্ধারণ করে, নাকি সময় ও পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত মানুষের রাজনৈতিক পথ বেছে দেয়?