বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিসেম্বরে দলবল নিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ’ করার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাঁর এই ঘোষণার পেছনে কঠোর বিচার, অবান্তর দাবি এবং গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ দেখছে।
বিচার নিশ্চিত করার পক্ষে বিএনপি:
শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের বিচার প্রক্রিয়াকে সামনে এনেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ট যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, “ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের একটি মামলায় বিচার শেষে ঢাকার আদালতে ফাঁসির রায় হয়েছে। আরও অনেক হত্যা মামলায় আদালতে তার বিচার চলছে।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হাসিনা অপরাধের দায়ে দেশে ফিরবেন কি না, তা তাদের দলীয় বিষয়; তবে দেশের জনগণ এই খুনের মহাযজ্ঞের চূড়ান্ত বিচার চায় এবং আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। শেখ হাসিনার ‘আদালত প্রহসনমূলক’ দাবির জবাবে রিজভী তাঁর আমলের সাবেক যুদ্ধাপরাধের বিচারের স্কাইপ কেলেঙ্কারির কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার আদালতে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না।
সরকারের অভ্যন্তরেই ষড়যন্ত্র দেখছে জামায়াত:
জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শেখ হাসিনার এই ঘোষণার পেছনে গভীর রহস্য ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দেখছেন। তিনি দাবি করেন, “বর্তমান সরকারের অভ্যন্তরের কোনো অংশ যে ওই ষড়যন্ত্রের সাথে নেই, এটা আমরা বিশ্বাস করি না। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কড়া কথা বলছেন, কিন্তু আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কোনো অংশ পরিকল্পিতভাবে কাজ করে থাকতে পারে।” তবে কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামি যদি দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আইনের কাছে সোপর্দ হতে চায়, তবে আইনিভাবে সেটি সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জামায়াতের এই বিস্ফোরক অভিযোগকে সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বিএনপি সরকারের একজন মন্ত্রী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মন্ত্রী পাল্টা সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাথেই জামায়াতের কোনো গোপন সমঝোতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ফাঁসি কার্যকর করার দাবি এনসিপির:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরে, কেবলমাত্র ফিরবে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য। ফলে সেটার জন্য আমরাও চাই যে ফাঁসির রায় কার্যকর হোক।” তিনি আরও বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি হিসেবে দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনার এমন সাক্ষাৎকার দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই এবং এটি দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। এ বিষয়ে দিল্লিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় হয়। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে সারাদেশে ৪৫৩টি হত্যা মামলাসহ মোট ৬৬৩টি মামলা ঝুলছে।