শহীদুল ইসলাম শরীফ, দোহার {ঢাকা} প্রতিনিধি
৫ জুলাই ২০২৬, ৬:৩২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইতিহাসের অনন্য দলিল: কীভাবে সুয়েজ খালে জন্ম নিয়েছিল ‘দ্য ইয়েলো ফ্লিট’

ইতিহাসে এমন অনেক কালো অধ্যায় রয়েছে যেখানে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বৈরিতা মানুষকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রের ঠিক মাঝখানে ঘটেছিল সম্পূর্ণ বিপরীত ও এক অভূতপূর্ব ঘটনা। সুয়েজ খালে দীর্ঘ ৮ বছর (১৯৬৭-১৯৭৫) অবরুদ্ধ থাকার পর, ৮টি ভিন্ন দেশের ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকেরা একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা দূর করতে নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য ‘স্বঘোষিত রাষ্ট্র’ বা ক্ষুদ্র সমাজ। মরুভূমির ধূলিকণায় জাহাজগুলোর রং কালচে-হলুদ হয়ে যাওয়ায় ইতিহাসে এগুলোকে একসাথে ‘দ্য ইয়েলো ফ্লিট’ (The Yellow Fleet) বা হলুদ নৌবহর বলা হয়।

যেভাবে শুরু হয়েছিল এই দীর্ঘ অবরুদ্ধ জীবন:

১৯৬৭ সালের ৫ জুন ইসরায়েল এবং আরব দেশগুলোর (মিশর, সিরিয়া, জর্ডান) মধ্যে বিখ্যাত ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ (Six-Day War) শুরু হয়। সেই মুহূর্তে সুয়েজ খাল দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাচ্ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো। যুদ্ধ শুরু হতেই, মিশরীয় কর্তৃপক্ষ সুয়েজ খালের দুই প্রান্তেই নিজেদের যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য নৌযান ডুবিয়ে এবং মাইন পেতে খালের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। ফলে জাহাজগুলোর সামনে বা পেছনে যাওয়ার কোনো পথ খোলা ছিল না। বাধ্য হয়ে জাহাজগুলো সুয়েজ খালের সবচেয়ে প্রশস্ত অংশ—’গ্রেট বিটার লেক’-এ নোঙর করে। মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ইসরায়েলকে সুয়েজ খাল ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় এই অবরোধ দীর্ঘ ৮ বছর স্থায়ী হয়।

‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (GBLA) ও বৈশ্বিক ঐক্য:

মাসের পর মাস সাগরের মাঝে অলস বসে থাকায় নাবিকদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ভর করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে ব্রিটিশ জাহাজ ‘মেলাম্পাস’ (MS Melampus)-এর ওপর সব জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদল একটি সভায় মিলিত হয়ে গঠন করেন ‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (GBLA)। এই জোটে ছিল যুক্তরাজ্য (৪টি), পশ্চিম জার্মানি (২টি), পোল্যান্ড (২টি), যুক্তরাষ্ট্র (২টি), সুইডেন (২টি), ফ্রান্স (১টি), বুলগেরিয়া (১টি) ও চেকোস্লোভাকিয়ার (১টি) জাহাজ। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ‘এসএস অবজারভার’ নামের আরেকটি জাহাজ এই অ্যাসোসিয়েশনের অফিশিয়াল মেম্বার হতে পারেনি, তাই মোট ১৫টি জাহাজ আটকে থাকলেও অ্যাসোসিয়েশনের অংশ ছিল ১৪টি।

শীতল যুদ্ধের (Cold War) চরম উত্তেজনার সময়েও মার্কিন, ব্রিটিশ ও সোভিয়েত ব্লকের নাবিকেরা সমস্ত রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে পরম বন্ধুর মতো একসাথে বসবাস শুরু করেন। অ্যাসোসিয়েশন গঠনের পর প্রতিটি জাহাজকে নির্দিষ্ট সামাজিক দায়িত্ব বা ‘মন্ত্রণালয়’-এর কাজ দেওয়া হয়েছিল। যেমন— বুলগেরিয়ার জাহাজ ‘ভাসিল লেভস্কি’ রূপান্তরিত হয়েছিল সিনেমা হলে, সুইডিশ জাহাজ ‘কিলারা’ তে ছিল সুইমিং পুল, রবিবারের ধর্মীয় প্রার্থনা হতো পশ্চিম জার্মানির জাহাজ ‘নর্ডউইন্ড’-এ, আর পোলিশ জাহাজে ক্রুদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। এমনকি ব্রিটিশ জাহাজ ‘পোর্ট ইনভারকারগিল’-এর বিশাল ডেকটিকে বানিয়ে ফেলা হয়েছিল একটি ফুটবল মাঠ!

বিটার লেক অলিম্পিক ও নিজস্ব ডাক ব্যবস্থা:

১৯৬৮ সালে যখন মেক্সিকো সিটিতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক চলছিল, তখন এই নাবিকেরা বিটার লেকের বুকেই আয়োজন করেন ‘বিটার লেক মিনি-অলিম্পিক’। লাইফ বোট দিয়ে পাল তোলা নৌকা বাইচ, ডাইভিং, হাই জাম্পসহ ১৪টি ইভেন্টে ৮টি দেশের নাবিকেরা অংশ নেন। এই অ্যাসোসিয়েশনের সবচেয়ে বড়ো কীর্তি ছিল তাদের নিজস্ব ডাক ব্যবস্থা। তারা নিজ হাতে রঙ-তুলি দিয়ে নকশা করে এক ধরনের বিশেষ ডাকটিকিট (Stamps) তৈরি করত, যার বৈধতা খোদ মিশরীয় ডাক কর্তৃপক্ষও স্বীকৃতি দিয়েছিল। আজ ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের কাছে এই ‘বিটার লেক লোকাল স্ট্যাম্পস’ অত্যন্ত মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য বস্তু।

মুক্তির আনন্দ ও হামবুর্গে বীরোচিত সংবর্ধনা:

১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পর অবশেষে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে সুয়েজ খাল পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের মে মাসে দীর্ঘ ৮ বছর পর সুয়েজ খাল পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়। এই দীর্ঘ সময়ে রোটেশনের মাধ্যমে প্রায় ৩,০০০ নাবিক এখানে দায়িত্ব পালন করেন। তবে, ৮ বছর পর যখন চলাচলের অনুমতি মেলে, তখন ১৪টি জাহাজের মধ্যে কেবল দুটি জার্মান জাহাজ—‘মুনস্টারল্যান্ড’ এবং ‘নর্ডউইন্ড’ নিজেদের ইঞ্জিনের ক্ষমতায় সচল ছিল। ১৯৭৫ সালের মে মাসে যখন তারা জার্মানির হামবুর্গ বন্দরে পৌঁছায়, তখন ৩০,০০০ মানুষ তাদের বীরোচিত সংবর্ধনা দেয়। বাকি জাহাজগুলোকে টেনে (Towed) নিয়ে যেতে হয়েছিল।

‘দ্য ইয়েলো ফ্লিট’-এর এই অবিশ্বাস্য ইতিহাস কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এটি বিংশ শতাব্দীর সামুদ্রিক ইতিহাসের অত্যন্ত সুপ্রমাণিত একটি সত্য ঘটনা; যা বিবিসি (BBC), আল জাজিরা, টাইম ম্যাগাজিন এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মতো বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং রাজনৈতিক বৈরিতার ঊর্ধ্বে উঠেও মানুষ চাইলে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে এক টুকরো স্বর্গ তৈরি করতে পারে।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ: খুলনায় জাতীয় ছাত্রশক্তির সংগঠক ফাহিম মিয়া স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত

১

Nouveau casino en ligne : les limites et les règles de jeu responsable

২

Spotify Review 2026

৩

গঙ্গাচড়ায় ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ, কঠোর হুঁশিয়ারি

৪

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শিবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ

৫

রাজশাহীতে চোরাই ল্যাপটপ ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

৬

শতবর্ষী বিদ্যালয়ের মাঠে ড্রেন নির্মাণ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

৭

ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল

৮

মাদ্রাসা শিক্ষককে পেটানোই সমাধান নয়, অপরাধীর পরিচয় ধর্ম নয়, অপরাধীই: সাম্প্রদায়িক ট্যাগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ

৯

রাজশাহীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে, পুনর্বাসিত হবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

১০

নোবিপ্রবিতে নবীনবরণ ৭ নভেম্বর, থাকছেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা

১১

তাড়াইলে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট, ২ হাজার ৬০০ টাকাতেও মিলছে না সিলিন্ডার

১২

বাঘারপাড়ার জহুরপুরে ২০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, প্রকৃতির অনন্য তোরণ

১৩

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ পালিত: আলোচনা সভা ও মানববন্ধন

১৪

ডিপিসি সম্পন্ন, তবু পদোন্নতির জিও নেই: অপেক্ষায় ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার

১৫

নবীনগরে গাছের চারা লাগানো নিয়ে বিরোধ, বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৬

সুন্দরবনে জাহাজের ধাক্কায় ডুবল কয়লাবাহী কার্গো, তলিয়ে গেল ১,২৫০ টন কয়লা

১৭

মিরসরাইয়ের নতুন ইউএনও মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জনসেবায় বাড়ছে প্রত্যাশা

১৮

নির্বাচন কমিশনকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় জোটের

১৯

টঙ্গীর শিশু নিপীড়ন বিতর্কে নতুন মোড়, দেশ ছাড়ার দাবি শিশুটির বাবার

২০