স্ট্রবেরি, মাল্টা ও ড্রাগন ফলের পর এবার পদ্মাপাড়ের জেলা রাজশাহীতে শুরু হয়েছে আঙুরের সফল বাণিজ্যিক চাষ। জেলার তরুণ কৃষকেরা এখন উচ্চমূল্যের ও জনপ্রিয় এই ফল চাষে দারুণ আগ্রহী হয়ে উঠছেন। রাজশাহীর মাটি ও আবহাওয়া আঙুর চাষের অনুকূল হওয়ায় এবং উৎপাদিত ফল বেশ সুমিষ্ট হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে বাগানের পরিধি।
ইমাম হোসেন সাগরের ৩ বিঘার আঙুর সাম্রাজ্য:
সবুজের সতেজতার মাঝে থোকায় থোকায় ঝুলছে খয়েরি, সবুজ আর কালচে রঙের আঙুর। প্রতিটি থোকাই টসটসে রসে ভরপুর। এমন নজরকাড়া দৃশ্য দেখা যাবে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাসনিপুর গ্রামের তরুণ খামারি ও পেশায় প্রকৌশলী ইমাম হোসেন সাগরের আঙুর বাগানে। ৩ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা এই বাগানে রয়েছে বাইকুনুর, অ্যাপোলো, দাসুনিয়া ও অস্ট্রেলিয়ান কিং-সহ বিশ্বখ্যাত ৮টি উন্নত জাতের আঙুর।
উদ্যোক্তা ইমাম হোসেন সাগর বলেন, “যশোরে একটি বাগানে আঙুরের চমৎকার ফলন দেখে আমি, আমার বাবা ও ছোট ভাই মিলে এই বাগান তৈরির সিদ্ধান্ত নিই। ২ থেকে ৩ বিঘা জমিতে আমরা প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম।”
রেকর্ড ফলন ও লাখ টাকার চারা বিক্রি:
চলতি মৌসুমে সাগরের বাগানের ৩৬০টি গাছ থেকে রেকর্ড ৭ হাজার ২১ কেজি আঙুর উৎপাদিত হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২১ লাখ টাকা। শুধু ফলই নয়, আঙুর উৎপাদনের পাশাপাশি এসব বাগান থেকে তৈরি হচ্ছে উন্নত মানের চারা। গাছের ছাঁটাই করা ডাল (কাটিং) থেকে বছরে তৈরি হচ্ছে শত শত চারা। প্রতি পিস চারা মানভেদে ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। চারা বিক্রি করেই বছরে উদ্যোক্তাদের আয় হচ্ছে অন্তত ১৫ লাখ টাকা।
আমদানি নির্ভরতা কমানোর তাগিদ ও কৃষি বিভাগের বক্তব্য:
অতীতে রাজশাহীর চাষিরা আঙুর চাষে চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাননি। তবে এবার আবহাওয়ার বিশেষ কৌশলগত পরিবর্তন এবং আধুনিক ‘পলিশেড হাউস’ পদ্ধতি ব্যবহার করায় বাণিজ্যিক সাফল্য এসেছে। এই সাফল্য দেখে জেলার বাগমারা, গোদাগাড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলার অন্য কৃষকেরাও বাগান করার স্বপ্ন বুনছেন এবং চারা সংগ্রহ করছেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “বর্তমানে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ৩০ জন প্রান্তিক ও তরুণ খামারি ৩ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আঙুরের চাষ করছেন। এই আবাদ যদি আমরা আরও বাড়াতে পারি এবং আমাদের লোকাল মার্কেটটা ধরতে পারি, তবে আঙুরের বৈশ্বিক আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমে যাবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।”
উদ্যোক্তারা জানান, একটি আঙুর গাছের গড় জীবনকাল অন্তত ৩০ বছর। ফলে প্রাথমিক খরচের পর এর পরিচর্যা ব্যয়ের তুলনায় লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রাজশাহীর আঙুর দেশের ফলের বাজারে বড় বিপ্লব ঘটাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।