রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকায় সৌদি প্রবাসী মোকাররম মিয়াকে (৩৭) নৃশংসভাবে হত্যার পর তাঁর মরদেহ আট টুকরা করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক নারী ও তাঁর কিশোরী মেয়েকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
আজ সোমবার (১৮ মে) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে র্যাব-৩ জানায়, শনিবার দিবাগত রাতে মান্ডা এলাকায় এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে হেলেনা বেগম (৪০) ও তাঁর ১৩ বছর বয়সী মেয়ে হালিমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনা নামে আরেক নারীকে খুঁজছে বাহিনীটি। নিহত মোকাররম মিয়ার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন।
যেভাবে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা:
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, একই গ্রামের বাসিন্দা ও আরেক সৌদি প্রবাসী সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তারের সঙ্গে মোকাররমের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে সৌদি আরবে থাকা অবস্থায়। সেই সম্পর্কের সুবাদে বিভিন্ন সময়ে মোকাররম তাসলিমাকে কয়েক লাখ টাকাও দেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ১৩ মে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন মোকাররম। তবে তিনি পরিবারের কাউকে না জানিয়ে সরাসরি ঢাকায় আসেন এবং তাসলিমার সঙ্গে দেখা করেন। পরে তাঁরা মান্ডা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন, যেখানে হেলেনা তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন।
বিয়ের চাপ, ব্ল্যাকমেইল ও হত্যার পরিকল্পনা:
র্যাব দাবি করেছে, ওই বাসায় ওঠার পর মোকাররম ও তাসলিমার মধ্যে বিয়ে এবং পূর্বের দেওয়া টাকা ফেরত নিয়ে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে মোকাররম তাঁর টাকা ফেরত চান এবং তাসলিমার কিছু ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। একই সঙ্গে হেলেনার কিশোরী মেয়ের সঙ্গেও মোকাররম অসামাজিক আচরণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে তাসলিমা ও হেলেনা মিলে মোকাররমকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।
ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বটি-হাতুড়ি দিয়ে নৃশংসতা:
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র্যাব জানায়, পরিকল্পনামাফিক পরদিন সকালে নাস্তার সময় মোকাররমকে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি পান করানো হয়। তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে প্রথমে বালিশ চাপা দিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এ সময় প্রাণপণে ধস্তাধস্তির চেষ্টা করলে ধারালো বটি ও হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমের মাথায় ও শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
বাথরুমে মরদেহ ৮ টুকরা, মাথা ১ কিলোমিটার দূরে:
হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহটি বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ধারালো বটি দিয়ে নির্মমভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়। এরপর মরদেহের সাতটি অংশ পলিথিনে মুড়িয়ে বাসার নিচে ময়লার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয় এবং মাথাটি আলাদা করে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অন্য একটি নির্জন স্থানে ফেলে আসা হয়।
র্যাব জানায়, নৃশংস এই অপরাধ করার পরও অভিযুক্তরা পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনযাপন করার চেষ্টা করেন। ঘটনার পরদিন তাঁরা বাইরে ঘোরাঘুরি করেন, হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করেন এবং রাতে বাসার ছাদে আড্ডাও দেন।
৯৯৯-এ ফোন ও পরিচয় শনাক্ত:
হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর ওই বাসা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্দেহ হয়। পরে তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ময়লার স্তূপ থেকে মরদেহের খণ্ডাংশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরবর্তীতে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে নিহত মোকাররমের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
র্যাব আরও জানায়, গ্রেপ্তারকৃত হেলেনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে নিহতের মাথার অংশটি উদ্ধার করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী পলাতক তাসলিমাকে গ্রেপ্তারে র্যাবের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।