‘যাচ্ছিস না কেন প্র্যাকটিসে?’ মা জানেন না, মেয়ে কেন ১৮ বছর বয়সে ক্রিকেট ছেড়েছিল
কারণটা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন মেয়েটি। ঢাকার একটি পুরোনো ক্লাবের আবাসিক হোস্টেলে ওয়াশরুম ছিল মাত্র দুটি। গোসলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ১৮ বছর বয়সী সেই তরুণী সেদিন এক সতীর্থের সাথে কোচের ঘরের ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন।
সতীর্থ গোসলে ঢুকতেই কোচ তার বুকে স্পর্শ করেন। তিনি তখনই বেরিয়ে আসেন। কাউকে বলেননি। কয়েক বছর পর ক্রিকেটই ছেড়ে দেন। মা আজও জানেন না, মেয়ে কেন ক্রিকেট ছেড়েছিল।
এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হুইসেল’ এর ১১ মাসের অনুসন্ধানে এমনই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
দ্য হুইসেলের অনুসন্ধানে কী আছে?
১. ১১ মাস, ১০৪ জন: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বদরুদ্দোজা বাবু ও আবু সাঈদের নেতৃত্বে ৬৭ জন সাবেক ও বর্তমান নারী ক্রিকেটারসহ মোট ১০৪ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। অপ্রকাশিত নথি, কল রেকর্ড ও মাঠ পর্যায়ের যাচাই মিলিয়ে গত ১৫ বছরের চিত্র তুলে আনা হয়েছে।
২. একই ছক: জেলার মাঠ থেকে ঢাকার ক্লাব হোস্টেল, বিসিবির বয়সভিত্তিক ক্যাম্প থেকে জাতীয় দল — প্রতিটি ধাপে একই ছক। যাদের হাতে দল বাছাই, একাদশে জায়গা, কেন্দ্রীয় চুক্তির সিদ্ধান্ত, অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেই। প্রস্তাবে সাড়া না দিলে দলে না রাখা ও মানসিক চাপ দেওয়ার অভিযোগ।
৩. অভিযুক্ত কারা? প্রতিবেদনে নাম এসেছে তিন দশক ধরে কোচিং করানো খেলাঘর ক্লাবের কোচ রুহুল আমিন (বিসিবির বেতনভুক্ত কোচ), জাতীয় দলের সাবেক ম্যানেজার ও নির্বাচক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, সাইফুল ইসলাম খোকন, সজল আহমেদ চৌধুরী সহ আরও কয়েকজনের। যদিও তারা সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিসিবি সবই জানতো, কিন্তু ব্যবস্থা ছিল না:সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো বিসিবির ভূমিকা।
১. অভিযোগ কমিটিই ছিল না:।হাইকোর্টের ২০০৯ সালের রায় অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক, কিন্তু গত ১৬ বছরেও বিসিবিতে কার্যকর ও স্বাধীন কমিটি গড়ে ওঠেনি। যখন মেয়েটি হয়রানির শিকার হন, তখন বিসিবিতে অভিযোগ নেওয়ার কোনো কমিটিই ছিল না।
২. তদন্ত প্রতিবেদন ৯ মাস গোপন:২০২২ নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে তৎকালীন নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিসিবি বিচারপতি তারিক উল হাকিমের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে। সেই কমিটি ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিটি ৪টি অভিযোগের মধ্যে ২টিতে মঞ্জুরুলের বিরুদ্ধে “প্রাথমিক প্রমাণ” পায় এবং তার আচরণকে পেশাদার মানের পরিপন্থী ও হয়রানির সংজ্ঞায় পড়ে বলে উল্লেখ করে।
কিন্তু বিসিবি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি ৯ মাস। পরে হাইকোর্ট রুল জারি করার পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তাকে সব ধরনের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
৩. ড্যাডি’স বোর্ড: বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবালসহ উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যানও নাকি সেই তদন্ত প্রতিবেদন পড়েননি — এই অভিযোগটি এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল। বিসিবি নিজেই পরে স্বীকার করে নতুন করে অভিযোগ কমিটি গঠন করেছে, যার প্রধান নারী পরিচালক রুবাবা দৌলা।
খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৫টি সুপারিশ:
১. বিসিবির তদন্ত প্রতিবেদন অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ করতে হবে।
২. প্রতিটি জেলা, বিভাগ ও জাতীয় দলে স্বাধীন ও গোপন অভিযোগ বক্স এবং হটলাইন চালু করতে হবে, যেখানে সরাসরি হাইকোর্টের নীতিমালা অনুযায়ী নারী সদস্য থাকবেন।
৩. ক্লাবের কোচই ক্যাম্পের কোচ, নির্বাচকই ম্যানেজার — এই এক ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।
৪. ১৮ বছরের নিচে কিশোরী ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা নারী ম্যানেজার, নারী ফিজিও এবং সিসিটিভি-সহ নিরাপদ হোস্টেল নিশ্চিত করতে হবে।
৫. যৌন হয়রানির নীতিমালা শুধু কাগজে নয়, প্রতিটি নারী ক্রিকেটারকে মাতৃভাষায় বুঝিয়ে স্বাক্ষর নিতে হবে।
সেই মা আজও জানতে চান, মেয়ে কেন যায় না প্র্যাকটিসে। উত্তরটা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো নারী ক্রিকেটের নিরাপত্তার প্রশ্ন।