খলিফাতাবাদ থেকে বাগেরহাট — উলুঘ খান জাহানের হাতে গড়া মধ্যযুগের একমাত্র টিকে থাকা প্রশাসনিক শহর
বাগেরহাটে এটি আমার চতুর্থ সফর। কিন্তু এবার আগের চেয়ে বেশি বিস্তৃত পরিসরে ঘোরার সুযোগ হলো। আর প্রতিবারই মনে হয়েছে — এটা শুধু একটি জেলা নয়, এটি ৬০০ বছর আগের একটি জীবন্ত ইতিহাস।
বাগেরহাট শহরটি UNESCO কর্তৃক ১৯৮৫ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। এর আসল নাম ছিল খলিফাতাবাদ।
কে গড়েছিলেন এই শহর?
প্রায় ছয়শ বছর আগে, ইলিয়াসশাহী সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৩৬-১৪৫৯) এর সমসাময়িক কালে, ভৈরব নদীর তীরে সুন্দরবনের কূল ঘেঁষে এই শহর গড়ে তোলেন সেনাপতি উলুঘ খান জাহান (মৃত্যু ১৪৫৯ খ্রি.)। f2c4
তিনি শুধু সেনাপতি ছিলেন না, ছিলেন একজন সুফি সাধক ও নগর পরিকল্পনার ধারক, বাহক।
তিনি প্রথমে যশোরের (বর্তমান ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের বারো বাজার) হয়ে বাগেরহাটে আসেন। এখানে এসে তিনি এক অবিশ্বাস্য কাজ করেন — মাত্র এক দশকের মধ্যে গড়ে তোলেন একটি পূর্ণাঙ্গ শহর, যেখানে ছিল —
– ৩৬০টি মসজিদ (লোকমুখে প্রচলিত), রাস্তা, সেতু, প্রাসাদ
– পথ, হাট-বাজার
– এবং বিশাল বিশাল দিঘি — যেমন ১.৫ কিলোমিটার লম্বা ঘোড়া দিঘি, যা ছাড়া এই লবণাক্ত ডেল্টায় মানুষ বসবাসই করতে পারত না।
পরে নাসিরুদ্দীন নুসরত শাহের আমলে (১৫১৯-১৫৩২) এই শহরের পরিচয় পাওয়া যায় টাকশাল শহর হিসেবে।
‘খান-ই-জাহান রীতি’ কী?
খান জাহানের স্থাপত্যের একটি আলাদা পরিচয় আছে। ষাট গম্বুজ মসজিদের ভেতরের রঙিন খিলান — সেটাই এই রীতির নিদর্শন।
এই রীতির বৈশিষ্ট্য:
১. মিহরাব প্রাচীরে পোড়ামাটির অলঙ্করণ
২. অর্ধগোলকাকৃতির গম্বুজ ও চৌচালা নকশা
৩. কর্নার টাওয়ার
৪. পোড়া ইট ও চুন-সুরকির ব্যবহার 66ab
এটাই মধ্যযুগের মুসলিম শহরের একমাত্র টিকে থাকা স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র।
কেন UNESCO স্বীকৃতি দিল?
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি ১৯৮৫ সালে একে স্বীকৃতি দেয় কারণ — এটি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি পরিকল্পিত মুসলিম শহরের অসাধারণ উদাহরণ, যেখানে মসজিদ, সমাধিসৌধ, দিঘি, আবাসগৃহ সব একসাথে টিকে আছে। খান জাহানের মৃত্যুর পর শহরটি জঙ্গলে ঢেকে যায় প্রায় চারশ বছর, ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে আবার খুঁজে পায়।
বাগেরহাট মানে শুধু খান জাহান নয়।
বাগেরহাট মূলত খান জাহান আলীর স্মৃতিময় স্থান, তবে এর বাইরেও আছে ইতিহাস।
এই জেলার অযোধ্যা গ্রামে রয়েছে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের সময়ে নির্মিত অপূর্ব কোদলা মঠ। এছাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি জমিদার বাড়ি।
তাই বাগেরহাট নিঃসন্দেহে ঐতিহ্যপ্রেমীদের জন্য এক আকাঙ্ক্ষার ডেসটিনেশন — যার বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত বছর পূর্বের জীবন্ত সাক্ষী।
*#বাগেরহাট #ষাটগম্বুজমসজিদ #KhanJahanAli #UNESCO #খলিফাতাবাদ #কালান্তরনিউজ #রবিউলইসলামমল্লিক #BagerhatHeritage #WorldHeritage*