যে মাটিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়, সেই ঐতিহাসিক গল্লামারি বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের সামনেই বাজারের বর্জ্য ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
পচা সবজি, ফলের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন ও প্লাস্টিকের বর্জ্যে স্মৃতিসৌধের সামনের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকেরা।
ছবিতে দেখা যায়, গল্লামারি স্মৃতিসৌধের মূল ফটকের সামনের সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা।
পচা কলার ডগা, সবজির উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিকের বস্তা ও পলিথিনের বর্জ্যে এলাকাটি অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। স্মৃতিসৌধের সীমানাপ্রাচীরের অবস্থাও সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থানের সামনে এমন পরিবেশ কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। তবে বর্জ্য ফেলার সঙ্গে কারা জড়িত, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও বক্তব্য প্রয়োজন।
খুলনা শহরের কাছেই ময়ূর নদীর তীরবর্তী গল্লামারি বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এ এলাকায় মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন ও হত্যা করত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ গল্লামারি খাল ও আশপাশের এলাকায় ফেলে দেওয়া হতো।
খুলনা শহর মুক্ত হওয়ার পর গল্লামারি খাল ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ ট্রাকভর্তি মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। এ এলাকায় আনুমানিক ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
এ কারণে গল্লামারি বধ্যভূমি শুধু খুলনার নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থান।
গল্লামারিতে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় খুলনা জেলা পরিষদ। ২০০৮ সালে নির্মাণকাজের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০০৯ সালে মূল স্তম্ভ নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করা হয়।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১০ কোটি টাকা। তবে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না হওয়ায় সীমানাপ্রাচীর, প্রবেশপথ, নিরাপত্তাকক্ষ, বাগানসহ পরিকল্পনার বেশ কিছু কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায় বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্মৃতিসৌধের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নকাজ কবে শেষ হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন।
স্মৃতিসৌধের কেয়ারটেকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হায়দার সিকদার কালান্তর নিউজকে বলেন,
“গল্লামারি বাজার কমিটিকে বারবার বলেছি, ভাই ময়লা এখানে ফেলবেন না, এটা শহীদের রক্তে ভেজা জায়গা। তারা কর্ণপাত তো করেই না, উল্টা হুমকি ধামকি দেয়। বটিয়াঘাটা ইউএনও, জেলা পরিষদ, ডিসি অফিস সবখানে লিখিত দিয়েছি। কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয় না। আমি একা কী করব?”
তাঁর অভিযোগ, বাজারের বর্জ্য এখানে না ফেলার অনুরোধ জানানো হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেছেন।
তবে বাজার কমিটির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং হুমকি দেওয়ার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বাজার কমিটি, উপজেলা প্রশাসন, খুলনা জেলা পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা উচিত।
স্মৃতিসৌধের সামনে খোলা জায়গায় পচনশীল বর্জ্য জমে থাকলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি, মাছি-মশার বিস্তার এবং পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্য নালা বা জলাশয়ে গিয়ে পড়লে জলজ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গল্লামারি এলাকার আশপাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলা স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও পথচারীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে।
তবে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া বা চর্মরোগের প্রকোপ বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য পাওয়া প্রয়োজন। একইভাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
১. জরুরি ভিত্তিতে বর্জ্য অপসারণ: গল্লামারি স্মৃতিসৌধের সামনে জমে থাকা ময়লা দ্রুত অপসারণ এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।
২. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি: বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসন, খুলনা সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান, ডাস্টবিন ও প্রয়োজনীয় নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. অসম্পূর্ণ উন্নয়নকাজ সম্পন্ন: স্মৃতিসৌধের প্রকল্পের বর্তমান আর্থিক ও প্রশাসনিক অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে সীমানাপ্রাচীর, প্রবেশপথ ও নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে হবে।
৪. কেয়ারটেকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত: হায়দার সিকদারের হুমকির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নিরাপত্তাঝুঁকি পাওয়া গেলে তাঁর সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
গল্লামারি বধ্যভূমি কোনো সাধারণ স্থান নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের নির্মম ইতিহাস এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের স্মারক। এই স্থানের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
শহীদদের স্মৃতিসৌধের সামনে বর্জ্য জমে থাকার অভিযোগ সত্য হলে তা দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারা সেখানে বর্জ্য ফেলছে, কেন দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না এবং অসম্পূর্ণ উন্নয়নকাজ শেষ করতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেসব প্রশ্নের জবাবও জনগণের সামনে আসা উচিত।
শহীদদের প্রতি সম্মান শুধু স্মৃতিসৌধ নির্মাণে নয়, তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ রাখার মধ্যেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।