শিক্ষকের গায়ে অভিভাবকের হাত তোলার ঘটনা ঘিরে সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। কোনো অবস্থাতেই কারও গায়ে হাত তোলা সমর্থনযোগ্য নয়। তবে এ আলোচনার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার হয় সমাজ?
সম্প্রতি টঙ্গীর কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে ঘিরে নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিশুটির বাবার অভিযোগ, একজন শিক্ষক তাঁর মেয়েকে চুমু দেন এবং বিষয়টি বাড়িতে জানাতে নিষেধ করেন। জানালে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া ঘটনাটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
কালান্তর নিউজের এই সচেতনতামূলক প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষকসমাজকে হেয় করা নয়। বরং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলে ধরা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুর জ্ঞান, নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের জায়গা। সেখানে কোনো শিশুর শারীরিক শাস্তি, যৌন হয়রানি, ভয়ভীতি কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
মাদ্রাসা, সাধারণ স্কুল, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এতিমখানা কিংবা কোচিং সেন্টার, সব জায়গাতেই শিশুদের নিরাপত্তা সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে এবং প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, একজনের অপরাধের দায় প্রমাণ ছাড়া পুরো শিক্ষকসমাজ বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
অভিভাবকেরা বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা থেকে সন্তানকে শিক্ষকের কাছে রেখে যান। সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক শিক্ষকের দায়িত্ব।
শিশু যেন নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা আচরণ সম্পর্কে অভিযোগ জানাতে পারে এবং অভিযোগ জানানোর কারণে ভয়ভীতি বা শাস্তির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু নৈতিকতার পাঠ দিলেই হবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আচরণ ও ব্যবস্থাপনায়ও তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
একজন শিক্ষকের ওপর হামলা হলে তার প্রতিবাদ হওয়া স্বাভাবিক। একইভাবে কোনো শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেও দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি ওঠা উচিত।
শিক্ষকসমাজ, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। কোনো অভিযুক্তকে প্রভাব খাটিয়ে রক্ষা করা কিংবা তদন্তের আগেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা, কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাও সমান জরুরি।
১. সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট অভিযোগ গ্রহণকারী কর্মকর্তা এবং প্রয়োজনীয় হেল্পলাইন সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জানাতে হবে।
৩. শারীরিক শাস্তি, যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
৪. শিক্ষক ও কর্মচারীদের শিশু সুরক্ষা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলে শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যামেরাকে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
১. নির্যাতনের অভিযোগ পেলে তা গোপন না রেখে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
২. শিশু ও অভিভাবকদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৩. নিয়মিত অভিভাবক সভার মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
৪. অভিযোগের তদন্ত চলাকালে শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।
৫. ভালো শিক্ষক ও শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণকারীদের উৎসাহিত করতে হবে।
১. সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে ভয় পাওয়া কিংবা শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেলে শান্তভাবে তার সঙ্গে কথা বলুন।
২. বয়স উপযোগী ভাষায় ব্যক্তিগত সীমানা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং নিরাপদে সাহায্য চাওয়ার বিষয়ে সন্তানকে শেখান।
৩. সন্তান কোনো অভিযোগ করলে তাকে দোষারোপ করবেন না। মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং তার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিন।
৪. গুরুতর নির্যাতনের আশঙ্কা থাকলে দ্রুত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিন। নিজে তদন্ত করতে গিয়ে শিশুকে বারবার একই ঘটনা বলতে বাধ্য করবেন না।
একজন শিক্ষকের ওপর হামলার প্রতিবাদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়াও জরুরি। কোনো শিশুর নিরাপত্তা যেন প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার কারণে উপেক্ষিত না হয়।
শিশুরা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সচেতনতা, জবাবদিহি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
আসুন, কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, সব ধরনের শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক শিশুর জন্য নিরাপদ ও আস্থার জায়গা।
প্রতিবেদক: রবিউল ইসলাম
পরিচিতি: খুলনা প্রতিনিধি, কালান্তর নিউজ
কার্যকরী সদস্য, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, খুলনা