আজ ২২ অক্টোবর, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়।
সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে র্যালি, আলোচনা সভা, প্রচারপত্র বিতরণসহ নানা কর্মসূচি নেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, এসব উদ্যোগের প্রতিফলন কি দেশের সড়কগুলোতে দেখা যাচ্ছে?
সড়কে প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ। দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকে। স্বজন হারিয়ে অসংখ্য পরিবারে নেমে আসছে অনিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় শুধু দিবস পালন নয়, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। এই শোক থেকেই ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়কের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন।
তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়।
দিবসটির মূল লক্ষ্য সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা দীর্ঘদিনের একটি গুরুতর জননিরাপত্তা সমস্যা। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য, অপরিকল্পিত সড়ক নকশা এবং পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাও উদ্বেগজনক। হেলমেটের যথাযথ ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে প্রাণহানি ও গুরুতর আহতের ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র বুঝতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সময়সীমা বিবেচনা করা জরুরি। নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হতে পারে প্রাণহানি কমানোর অন্যতম উপায়।
সাংবাদিকতা এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় খুলনার বিভিন্ন সড়কে কয়েকটি সমস্যা বিশেষভাবে নজরে আসে।
১. ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অদক্ষ চালক
খুলনা-মোংলা ও খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কসহ বিভিন্ন রুটে যানবাহনের ফিটনেস, চালকের বৈধ লাইসেন্স এবং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। ইজিবাইক, মাহেন্দ্রসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচলে আইন ও নিরাপত্তাবিধি কার্যকরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
২. ফুটপাত দখলে পথচারীদের ঝুঁকি
খুলনা নিউমার্কেট, ডাকবাংলা ও শিববাড়ী মোড়ের মতো ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাত দখল এবং পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা থাকলে তাঁদের মূল সড়কে নামতে হয়।
এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি দরকার।
৩. বেপরোয়া গতি ও মোটরসাইকেল চালনায় অসতর্কতা
রূপসা সেতু থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কে রাতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনা ও গতির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই করে কার্যকর গতি নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক নজরদারি এবং মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে কঠোরতা বাড়ানো প্রয়োজন।
৪. আইনের প্রয়োগ ও তদারকির ঘাটতি
ট্রাফিক আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। জনবলসংকট, অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘাটতি এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার। আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হওয়াই নিরাপদ সড়কের অন্যতম শর্ত।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে খুলনা অঞ্চলের দিগরাজ-মোংলা সড়ক ও দাকোপের অভ্যন্তরীণ সড়কে সংস্কারকাজের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। নলিয়ান স্কুল মাঠে হেলিপ্যাড প্রস্তুতের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সড়ক সংস্কার অবশ্যই ইতিবাচক। তবে জনস্বার্থে প্রশ্ন উঠছে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সফর উপলক্ষে দ্রুত সংস্কার সম্ভব হলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের সড়কগুলোও কেন একই গুরুত্ব পাবে না?
সড়ক সংস্কার কোনো বিশেষ সফরের সাময়িক প্রস্তুতি হওয়া উচিত নয়। এটি নাগরিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ।
বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার সড়কে স্থায়ী সংস্কার, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, পানি নিষ্কাশন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা দরকার।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল সার্থকতা তখনই আসবে, যখন সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাবে।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:
এ ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সমন্বিত আইনগত কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। শুধু চালককে দোষারোপ না করে সড়কের নকশা, যানবাহনের মান, গতি নিয়ন্ত্রণ, পথচারীর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনাপরবর্তী চিকিৎসাসেবাকে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা সব সময় এড়ানো সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত ব্যবস্থা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে বহু দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে তাই আমাদের প্রত্যাশা, দিবসটি যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা ও প্রচার-প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সরকার, প্রশাসন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী ও পথচারী সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
নিরাপদ সড়ক কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের দাবি নয়। এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। সড়কে চলাচলের সময় মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই দিবসটির প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
নিরাপদ সড়ক গড়ি, প্রাণহানি রোধ করি। নিরাপদ যাত্রা হোক সবার অধিকার।