বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে বিপন্ন প্রজাতির বাঘ ও হরিণ রক্ষায় একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বন বিভাগ। বনে সক্রিয় ও সরাসরি বন্যপ্রাণী নিধনে জড়িত ১৫০ জন চিহ্নিত দুষ্কৃতকারী ও শিকারির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বাগেরহাটসহ উপকূলীয় অঞ্চলে সক্রিয় এই অপরাধী চক্রের তালিকাটি সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে হস্তান্তর করেছে বন প্রশাসন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিগত এক বছরে (মে ২০২৫ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত) সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে পরিচালিত ৪৭৪টি বিশেষ ও কৌশলগত অভিযানের মাধ্যমে এই চক্রের সদস্যদের নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম ও বন্যপ্রাণীর ভয়াবহ পরিসংখ্যান: এক বছরের অভিযানে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম অপরাধী চক্রের ভয়াবহতার গভীরতা প্রমাণ করে। বিগত ১ বছরে বনরক্ষীরা বনের দুর্গম ও গভীর এলাকার প্রায় ৩৫ কিলোমিটারজুড়ে পেতে রাখা ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৩ ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ (নাইলনের দড়ির বিশেষ ফাঁদ) উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এই সময়ে শিকারিদের কবল থেকে জীবিত অবস্থায় ১৭টি হরিণ ও একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ২৪৯ কেজি হরিণের মাংস এবং বিষ প্রয়োগে ধরা বিপুল পরিমাণ মাছ ও চিংড়ি জব্দ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, বনের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনে একটি বড় সিন্ডিকেট কাজ করছে। এছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ৪৪৮টি ট্রলার ও ১০০টি নৌকাসহ বিপুল পরিমাণ জাল ও বিষাক্ত কীটনাশক জব্দ করা হয়েছে।
মামলা ও গ্রেপ্তারের হিড়িক: সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, অপরাধীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের আইনের আওতায় আনতে বন বিভাগ সর্বোচ্চ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। গত এক বছরে দায়ের করা ২৪১টি সুনির্দিষ্ট বন মামলায় ৩৯৬ জন আসামির মধ্যে ৩৭৭ জনকেই ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ:
বন প্রশাসনের মতে, সুন্দরবনের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বনের গভীরে অপরাধীদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে নিয়মিত ‘ফুট পেট্রোলিং’ এবং স্মার্ট টহল জোরদার করার ফলে অপরাধীরা এখন আর আগের মতো নির্বিঘ্নে বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারছে না।
বর্তমানে চিহ্নিত ১৫০ জন বন্যপ্রাণী শিকারির বিরুদ্ধে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি শুরু হয়েছে। বনের নিরাপত্তা বলয় আরও কঠোর করার পাশাপাশি এই চিহ্নিত পাচারকারী ও শিকারিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের হাত থেকে পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।