পারস্য উপসাগরে প্রায় চার মাস অবরুদ্ধ থাকার পর অবশেষে কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সফলভাবে পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টায় জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সমর্থ হয়। বর্তমানে প্রয়োজনীয় জ্বালানি (বাংকারিং) নেওয়ার জন্য জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং বিএসসির সুনিপুণ নৌ-কৌশলে জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি ক্রু ও নাবিক সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ অবস্থায় এই চরম বৈশ্বিক সংকট থেকে মুক্ত হলেন।
সংকটের পটভূমি ও অবরুদ্ধ হওয়ার ক্রোনোলজি: বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, গত ২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি হরমুজ হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছিল। কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। এর ঠিক পরদিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক পরাশক্তি আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হলে হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
একাধিকবার বাধা ও ওমানে আশ্রয়: গত ১১ মার্চ পণ্য খালাসের পর নিরাপত্তার মারাত্মক ঝুঁকি বিবেচনায় বিএসসি জাহাজটিকে কেপটাউনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করে। পরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলে গত ৮ এপ্রিল জাহাজটি রওনা দেয়। তবে ১০ এপ্রিল হরমুজ পাড়ি দিতে গিয়ে পুনরায় ইরানি কোস্টগার্ডের বাধার মুখে পড়ে ওমানের মিনা সাকার বন্দরের বহির্নোঙরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় জাহাজটি। সর্বশেষ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সমঝোতা চুক্তি হওয়ার পর সফল কূটনীতির মাধ্যমে জাহাজটি অবমুক্ত হয়।
নাবিকদের সাহসিকতা ও বিশেষ প্রণোদনা:
২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজটিতে কর্মরত ৩১ জন ক্রুর সবাই বাংলাদেশি নাগরিক। দীর্ঘ অবরুদ্ধ সময়ে তাদের মনোবল ধরে রাখতে বিএসসির পক্ষ থেকে জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার, রসদ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছিল। পাশাপাশি নাবিকদের মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে দৈনিক ৫ মার্কিন ডলার বিশেষ মিল অ্যালাউন্স, ঈদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য বিশেষ ‘ওয়ার ওয়েজ’ (ঝুঁকি ভাতা) প্রদান করা হয়েছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক এই ঐতিহাসিক সংকট উত্তরণ প্রসঙ্গে বলেন, “আমাদের নাবিকদের সীমাহীন সাহসিকতা, সুনিপুণ নৌ-কৌশল এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায় ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ এই চরম সংকটময় পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই স্পর্শকাতর যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আটকা পড়ে তারা যে অসীম ধৈর্য দেখিয়েছেন, তা বিশ্ব মেরিটাইম খাতে বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।”