উন্নয়নের নামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের আগে জনস্বার্থ, প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব কমাতে নতুন কর্ডলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসায় প্রকল্পটির ব্যয়, সম্ভাব্য সুফল এবং বিকল্প নির্মাণপদ্ধতি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এক কেজি চালের দাম ৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৩০ টাকা করা হলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করবেন। অথচ জনগণের করের টাকায় বাস্তবায়িত কোনো প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেলে সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে কতটা প্রশ্ন ওঠে? সরকারি অর্থ কোনো মন্ত্রী, সচিব, ঠিকাদার কিংবা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এই অর্থের উৎস জনগণের কর, ভ্যাট ও রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়। ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তার আর্থিক দায়ও শেষ পর্যন্ত জনগণকে বহন করতে হয়।
ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথ দেশের যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর, শিল্পকারখানা ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রচলিত রেলপথে টঙ্গী, ভৈরব, আখাউড়া, কুমিল্লা ও লাকসাম হয়ে ট্রেন চলাচল করে। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে কুমিল্লার দিকে সরাসরি কর্ডলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।
২০২৩ সালে এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশা তৈরির উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হয়। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবেও প্রকল্পটি আলোচনায় আসে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন রেললাইন নির্মিত হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমতে পারে।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ১১ জুন ২০২৬।
দূরত্ব কমার অর্থ শুধু যাত্রীদের সময় সাশ্রয় নয়। এর ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ কমানো, ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের অর্থনীতিতে গতি আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুফল নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবসম্মত, ব্যয় হতে হবে যুক্তিসংগত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপে থাকতে হবে জবাবদিহি।
উন্নয়নকে শুধু সেতু, ফ্লাইওভার, বহুতল ভবন কিংবা মেগাপ্রকল্পের আকার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কত মানুষ উপকৃত হলো, কত সময় ও অর্থ সাশ্রয় হলো এবং মানুষের জীবনযাত্রা কতটা সহজ হলো।
যে প্রকল্প তুলনামূলক কম খরচে বেশি মানুষকে সেবা দিতে পারে, সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বিপুল ব্যয়ের কোনো প্রকল্পের সুফল অনিশ্চিত হলে অনুমোদনের আগে তার প্রয়োজনীয়তা ও বিকল্পগুলো যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে।
প্রকল্পের আকার বড় হলেই সেটি উন্নয়নের প্রমাণ নয়। জনস্বার্থে তার কার্যকারিতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফলই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।
ঢাকা–কুমিল্লা কর্ডলাইনের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের কথা আলোচনায় এসেছে। কিন্তু শুধু প্রতি কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের আনুমানিক ব্যয় দিয়ে পুরো প্রকল্পের খরচ নির্ধারণ করা যায় না।
জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, নদী পারাপার, স্টেশন, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, রেলক্রসিং, নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলার ব্যয়ও হিসাব করতে হবে। জমির ধরন ও অবস্থানভেদে অধিগ্রহণের খরচেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকতে পারে।
তাই ৮১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা লাগবে, নাকি ৮৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে, এমন অঙ্ক গ্রহণের আগে সরকারি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা ও অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে সাধারণ রেলপথ, উড়ালপথ এবং বিকল্প করিডর নির্মাণের ব্যয় তুলনা করতে হবে। শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বিবেচনায় নিতে হবে। নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান বজায় রেখে যে বিকল্প সর্বনিম্ন দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ে সর্বোচ্চ জনসেবা দিতে পারবে, সেটিই বেছে নেওয়া উচিত।
প্রকল্পের ব্যয় যত বড় হবে, তার যৌক্তিকতা ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়বে। দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের অগ্রগতি, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। অনিয়মের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে নিতে হবে আইনানুগ ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে রেল প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়নের সময় বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। দ্য ডেইলি স্টারে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৩টি রেল প্রকল্পের মধ্যে সাতটিতে ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। কয়েকটি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির হারও ছিল উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদনটিতে দুর্বল পরিকল্পনা, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, নকশা পরিবর্তন এবং কাজের পরিধি বাড়ানোর মতো বিষয়কে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ‘13 railway projects: Cost overrun up to 260pc, time 9.5 years’, ২০২৩।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকল্প অনুমোদনের আগেই পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা, জমির হিসাব, নির্মাণপদ্ধতি, পরিবেশগত প্রভাব, ব্যয় ও সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বাস্তব প্রয়োজন ছাড়া মাঝপথে নকশা পরিবর্তন এবং ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
কারণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়লে শুধু একটি প্রকল্পের বাজেটই বাড়ে না; অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দ ও উন্নয়ন কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হতে পারে।
ঘনবসতিপূর্ণ দেশে নতুন রেলপথ নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে এসব সমস্যা উন্নয়ন বন্ধ রাখার অজুহাত নয়; বরং এগুলো মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রকল্প অনুমোদনের আগেই পূর্ণাঙ্গ জরিপ, প্রকৃত জমির মালিক শনাক্তকরণ, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। মালিকানা বিরোধ আইনসম্মতভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।
জাল কাগজপত্র কিংবা অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি প্রকৃত মালিকদের অধিকার উপেক্ষা করে উচ্ছেদ করাও গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরিচয় শুধু উচ্ছেদে নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে জনস্বার্থের প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেও নিহিত।
মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও ঠিকাদার, প্রত্যেকেরই প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্ব রয়েছে। তাই প্রত্যেকের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকল্পটি কেন প্রয়োজন, এর বিকল্প কী, ব্যয় কত, সম্ভাব্য সুফল কী এবং ঝুঁকিগুলো কোথায়, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকল্প অনুমোদনের আগেই স্পষ্ট হওয়া দরকার। প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে।
কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী বলা যাবে না। আবার প্রভাবশালী হওয়ার কারণে কাউকে তদন্তের বাইরে রাখাও উচিত নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণই সুশাসনের শর্ত।
ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ–কুমিল্লা কর্ডলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা, অনুমোদিত ব্যয়, অর্থনৈতিক সুফল ও ঝুঁকির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সমতল রেলপথ, উড়ালপথ এবং অন্যান্য বিকল্পের নির্মাণ, পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের অগ্রগতি এবং ব্যয় বৃদ্ধির কারণ প্রকাশ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান করে দায় নির্ধারণ করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা ব্যয় হলো বা কত শতাংশ কাজ শেষ হলো, তা দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। কত সময় সাশ্রয় হলো, পণ্য পরিবহনের খরচ কতটা কমল এবং সাধারণ মানুষ কতটা উপকৃত হলেন, সেসব সূচকও বিবেচনায় নিতে হবে।
ষষ্ঠত, উন্নয়ন বাজেটে হাসপাতাল, শিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান, নাগরিক সেবা ও স্থানীয় অবকাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নেও পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি অর্থ ব্যয় করা সহজ, কিন্তু সেই অর্থের বিপরীতে যথাযথ সুফল নিশ্চিত করা কঠিন। একটি প্রকল্পের উদ্বোধন হয়তো কয়েক ঘণ্টার ঘটনা, কিন্তু তার ঋণ পরিশোধ ও রক্ষণাবেক্ষণের আর্থিক বোঝা বহন করতে হয় বহু বছর।
আমরা মেগাপ্রকল্পের বিরোধী নই। আমাদের আপত্তি অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, দুর্বল পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিহীন উন্নয়নের বিরুদ্ধে। আমরা চাই না শুধু প্রকল্পের আকার কিংবা বাজেট বাড়ুক; আমরা চাই মানুষের জীবন সহজ হোক এবং সরকারি অর্থের প্রতিটি ব্যয়ের বিপরীতে দৃশ্যমান জনস্বার্থ নিশ্চিত হোক।
কারণ উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয় কংক্রিটের পরিমাণে নয়, মানুষের জীবনে তার সুফলে।
জনগণের টাকা জনগণের সম্পদ। এই অর্থের প্রতিটি ব্যয়ের হিসাব জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। তাই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন নিশ্চিত করা।