স্ত্রী নিজের সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ছেড়ে সংসার সামলেছেন—এমন গল্পে সচরাচর ফেসবুকের টাইমলাইন ভাসে, জোড়ে লাখ লাখ লাইক ও প্রশংসা। কিন্তু যে স্বামী নিজের দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ, চাকুরির প্রমোশন কিংবা ব্যক্তিগত শখ বিসর্জন দিয়ে স্ত্রীর বিসিএস, পিএইচডি বা স্বপ্নের চাকুরির প্রস্তুতির জন্য রাত জেগেছেন—সেই গল্প আমরা কজন শুনি?
সমাজ ও সংবাদমাধ্যমে জেমসের মতো তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনের ঘাড় ধাক্কার গল্প বা বিতর্ক নিয়ে আমরা যতটা সরব, ঠিক ততটাই নীরব সেই সাধারণ স্বামীর গল্পে, যিনি নিজের পকেটের শেষ টাকা দিয়ে স্ত্রীর পরীক্ষার ফর্ম ফিলআপ করে দেন।
আমরা অভিনেতা ফারুক হোসেনকে কাঠগড়ায় তুলি অভিনেত্রী ফুলিকে অভিনয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে। কিন্তু অসংখ্য পুরুষ যে নিজের মিডিয়া ক্যারিয়ার বা স্বপ্নের পেশা ছেড়ে পরিবারকে সময় দিয়েছেন, তার খবর বা হিসেব সমাজ রাখে না। কারণ, ‘স্যাক্রিফাইসিং স্বামী’র গল্প মিডিয়ার টিআরপি (TRP) বাড়ায় না।
অভিনেতা সোহেল খান যখন খোলাখুলি বলেন—“সংসারে বাজার নাই, নুন নাই”, আমরা সেটা শুনে হাসি বা ট্রোল করি। অথচ এর গভীরে লুকিয়ে থাকা নীরব দায়িত্ববোধের আক্ষেপটা আমরা দেখি না; তিনি শুধু চান যেকোনো মূল্যে ঘরটা যেন সুন্দরভাবে চলে।
এমনকি তাহসান-মিথিলার মতো বহুল আলোচিত বিচ্ছেদের ঘটনায় সমাজ খুব সহজেই একজনকে ভিলেন বানিয়ে দেয়। অথচ বিচ্ছেদের পরও যে পুরুষটি প্রাক্তন স্ত্রীকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে একটিও কটু কথা না বলে নীরব থাকেন—সেই নীরবতা যে একজন পুরুষের সর্বোচ্চ ভদ্রতা, আত্মসম্মান ও সম্মানবোধের পরিচয়, তা আমরা এড়িয়ে যাই।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পুরুষকে ‘প্রভু’ বা কঠোর কাঠামোর প্রতিনিধি বানিয়ে তার ভেতরের কান্না, মানসিক চাপ ও ত্যাগের গল্পগুলোকে আড়াল করে রেখেছে। অথচ যে স্বামী স্ত্রীর প্রতিটি সাফল্যে সবার আগে হাততালি দেন, পরম আদরে সন্তানের ডায়াপার বদলে দেন, কিংবা সমাজ ও নিকটজনদের “বউয়ের টাকায় চলে” জাতীয় বিশ্রী টিটকারি হজম করেও স্ত্রীর স্বপ্নের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ান—সে কি আসল নায়ক নয়?
বাস্তবতা হলো, কোনো সংসারই কেবল একজনের একতরফা ত্যাগে চিরস্থায়ী হয় না।
তাই সমাজ ও পরিবারে কেবল ‘স্যাক্রিফাইসিং স্ত্রী’র গল্প নয়, এবার উন্মুক্ত হোক ‘স্যাক্রিফাইসিং স্বামী’দের নীরব অবদানের গল্পও। কারণ, একজন সফল ও সুখী স্ত্রীর পেছনে গর্বিত অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর গল্পটা হয়তো অন্য যেকোনো গল্পের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর।