খুলনার কয়রা উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য-সংগ্রহকারী নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিয়োগ বাতিল ও পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ও বঞ্চিত প্রার্থীরা।
অভিযোগ রয়েছে, তথ্য-সংগ্রহকারী পদে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের সময় বয়সসীমা অতিক্রম করার কারণ দেখিয়ে শাহনাজ পারভীন ও নিগার সুলতানা নামে দুজনের আবেদন বাতিল করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে তথ্য-সংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত তালিকায় তাদের নাম দেখা যায়। এর মধ্যে শাহনাজ পারভীনের নাম ফলাফল শিটে হাতে লিখে যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রার্থীরা। পরে সমালোচনার মুখে নিগার সুলতানার নিয়োগ বাতিল করা হলেও শাহনাজ পারভীনের নাম তালিকায় বহাল রাখা হয়।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জনবল নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ৮১ জন তথ্য-সংগ্রহকারী ও ৮ জন সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৯৪৯টি। গত ৩০ জুলাই যাচাই-বাছাই শেষে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে ৩৫৬টি আবেদন বাতিল করা হয়।
২ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আবেদনকারীদের দুপুর থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী দুই দিনও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
এরপর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে প্রায় দেড় মাস সময় নেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর করা ফলাফল ১৪ সেপ্টেম্বর প্রস্তুত হলেও তা ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় প্রকাশ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রকাশিত ফলাফলে মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ১১ জনের চূড়ান্ত তালিকার শেষে শাহনাজ পারভীনের নাম হাতে লিখে যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
অভিযোগকারী প্রার্থীদের দাবি, তথ্য-সংগ্রহকারী পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪০ বছর। কিন্তু শাহনাজ পারভীনের বয়স এ সীমার বেশি। মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. ফেরদাউসের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী শাহনাজ পারভীনের বয়স ৪২ বছর।
এছাড়া শাহনাজ পারভীন মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন মহিলা লীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার সুপারিশে ওই নারী পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন।
অন্যদিকে আবেদনকারী জিয়াউল হক অভিযোগ করেন, তথ্য-সংগ্রহকারী পদে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়োগ পাননি। তার দাবি, শত শত পরীক্ষার্থীকে গভীর রাত পর্যন্ত পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। অথচ অনেকে পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ কমিটির সদস্যদের আত্মীয়-স্বজন নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বিক্ষুব্ধ প্রার্থীরা বলেন, তারা পরীক্ষায় সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার পরও নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন। তারা নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে পুনরায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান। এ বিষয়ে তারা ডাকযোগে জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর লিখিত আবেদনও দিয়েছেন বলে জানান।
নিয়োগ কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বয়স বেশি হওয়ায় ওই নারীকে যাচাই-বাছাইয়ের সময় বাদ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি বলে জানি। অথচ চূড়ান্ত ফলাফলে তার নাম দেখে বিস্মিত হয়েছি।”
নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “শুরুতেই ওই নারীকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। পরবর্তীতে একজন প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে তিনি নিয়োগ পেয়েছেন। এর বেশি কিছু বলতে চাই না। বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় আছি।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নিয়োগ কমিটির সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, “যথাযথ প্রক্রিয়া শেষ করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এরপরও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তথ্য-সংগ্রহকারী নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।