একটি শিশুর কোলে আরেকটি শিশু—এ দৃশ্য শুধু চোখে জল আনে না, গোটা সমাজ ও বিবেককে বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মাত্র ১৩ বছরের অনামিকা জুঁই। যে বয়সে তার স্কুলের বেঞ্চে সহপাঠীদের সঙ্গে বই-খাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলার মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা—সেই বয়সেই তাকে কোলজুড়ে নিতে হচ্ছে নিজের ৭ মাসের সন্তানকে।
যেভাবে হারিয়ে গেল শৈশব:
অনামিকার মা জীবিকার তাগিদে প্রবাসী হিসেবে সৌদি আরবে কর্মরত এবং বাবা একজন অটোরিকশা চালক। সংসারের চরম অভাব-অনটন আর মা-বাবার ব্যস্ততার ফাঁকে কেউ খেয়ালই করেনি—কখন ও কীভাবে ছোট্ট মেয়েটি স্মার্টফোনের অবাধ্য জগতে হারিয়ে যাচ্ছিল।
মাত্র ১২ বছর বয়সে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে পরিচয় হয় শাকিল নামের এক যুবকের সঙ্গে। সেই সূত্র ধরে প্রেম এবং পরিবারকে না জানিয়ে পালিয়ে বিয়ে। কিছুদিন পরই অনামিকার কোলজুড়ে আসে নতুন অতিথি। কিন্তু সেই ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের ইতি ঘটে খুব দ্রুতই। সন্তান জন্মের পর অনামিকাকে নির্যাতন করে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি বুকের দুধ খাওয়া থেকে শিশুটিকে বঞ্চিত রেখে জোরপূর্বক মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়।
আড়াই মাস পর কোল ফিরল অবুঝ শিশু:
নিপীরিত ও দিশেহারা অনামিকা শেষ ভরসা হিসেবে সরকারি লিগ্যাল এইড অফিসে গিয়ে আইনি সহায়তা চায়। পুরো ঘটনা শুনে হতবাক হয়ে যান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরবর্তীতে লিগ্যাল এইড ও স্থানীয় থানা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে দীর্ঘ আড়াই মাস পর ৭ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকে উদ্ধার করে কিশোরী মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
বিবেকের কাছে বড় প্রশ্ন— এই দায় কার?
অনামিকার পরিবার জানায়, তথাকথিত “মান-সম্মান” হারানোর ভয়ে তারা শুরুতে পুলিশ প্রশাসন বা আইনের কাছে যাননি। আর এই নীরবতার মাশুল দিতে হয়েছে দুটি নিষ্পাপ জীবনকে।
সমাজকর্মীদের মতে, সন্তান হারিয়ে যাওয়ার সূচনাটা অনেক সময় নিজের পরিবার থেকেই ঘটে, যখন একটি শিশু বাবা-মায়ের স্নেহের চেয়ে মোবাইলের পর্দায় অদেখা মানুষকে বেশি আপন ভাবতে শুরু করে। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে—সন্তানের হাতে দামি ফোন তুলে দেওয়া অভিভাবকত্বের মূল কাজ নয়; বরঞ্চ সন্তানকে সময় দেওয়া, বন্ধু হওয়া এবং তাদের মানসিকভাবে নিরাপদে রাখাই প্রধান দায়িত্ব।
অনামিকার এই হৃদয়বিদারক গল্প কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আধুনিক সমাজের প্রতিটি অসচেতন বাবা-মায়ের জন্য এক আশঙ্কাজনক সতর্কবার্তা।