রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী অঞ্চলে ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। ৬ নম্বর মাটিকাটা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এহসানুল কবির টুকু নামের ওই নেতার বিরুদ্ধে এলাকার একাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদ আঁকড়ে থাকা, লাখ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি জমি দখল এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতসহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেন পারিবারিক আখড়া ও পদের অপব্যবহার:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ই আগস্টের পর ঢাকা থেকে এলাকায় এসে দলীয় পদের প্রভাব খাটিয়ে একাই অন্তত পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ দখল করেছেন টুকু ও তাঁর পরিবার। নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত নিয়মিত কমিটি গঠনের নির্দেশ থাকলেও প্রেমতলী ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা টুকু তাঁর এলাকা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের ভাটোপাড়া বালিকা বিদ্যালয় এবং প্রেমতলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এর অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদ গত বছরের আগস্ট থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
টুকুর পিতা মৃত জসিম উদ্দিনের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘প্রেমতলী জসীমউদ্দীন দাখিল মাদ্রাসা’ এখন পারিবারিক আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তিন ভাই স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করলেও বড় ভাই শিক্ষানুরাগী, মেজো ভাই সভাপতি এবং টুকু নিজে বিদ্যুৎসাহী সদস্য সেজে পুরো মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। সম্প্রতি এই মাদ্রাসার দুটি করণিক (ক্ল্যারিক্যাল) পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় ২৬ লাখ টাকার বিপুল অঙ্কের ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ হয়েছে বলে এলাকায় জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।
রাশিয়ায় থেকেও তুলছেন সরকারি বেতন, হদিস নেই ফান্ডের:
সবচেয়ে বড় অনিয়মের চিত্র মিলেছে প্রেমতলী সুখ বাসিয়া উচ্চ বিদ্যালয়-এ। ৫ই আগস্টের পর এই বিদ্যালয়েরও সভাপতির চেয়ার বসেন টুকু। অভিযোগ রয়েছে, এই বিদ্যালয়ের একজন নিয়মিত শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ায় অবস্থান করলেও সভাপতি ও প্রশাসনের যোগসাজশে প্রতি মাসে তাঁর নামে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা (MPO) উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি অত্র বিদ্যালয়ে আসা প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার একটি বিশেষ ফান্ডেরও কোনো হদিস নেই।
এদিকে, প্রেমতলী ডিগ্রী মহাবিদ্যালয়-এর সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে পটপরিবর্তনের পর কলেজের প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপালকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এখন মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে তাঁদের পুনরায় ফিরিয়ে আনার গোপন চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোজাহারুল ইসলাম মোবাইলে বিস্তারিত কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
মসজিদের টাকা আত্মসাৎ, বালুমহাল ও সম্পত্তি দখল:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও টুকুর থাবা বিস্তৃত হয়েছে স্থানীয় বালুমহালে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় গড়ে ওঠা এই বালুমহালের লভ্যাংশ থেকে মসজিদের জন্য বরাদ্দকৃত জমানো প্রায় ১ লাখ টাকা বর্তমানে টুকুর কাছে থাকলেও তা দিতে তিনি নানা তালবাহানা করছেন। এছাড়া তীরবর্তী অঞ্চল থেকে জোরপূর্বক বালু তোলায় নদীগর্ভে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
অত্র অঞ্চলের ‘কালিদিঘি’ নামক স্থানের ৭২ বিঘা সম্পত্তি এবার অন্য একজন ডাকের মাধ্যমে বরাদ্দ পাওয়ায় টুকু এলাকায় ‘মব’ (উত্তেজিত জনতা) সৃষ্টি করেন। এমনকি কৃষকদের পানি না দিতে সরকারি গভীর নলকূপ (ডিপ) অপারেটর মিজানুর রহমানকে সরাসরি হুমকি দিয়ে ডিপটি জোরপূর্বক দখল করে নেন। পাশাপাশি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থান ‘গৌরাঙ্গ বাড়ি’-র সম্পত্তি নিয়েও টুকু দখল ও নয়ছয়ের চেষ্টা করছেন বলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্তের বক্তব্য মেলেনি:
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, টুকুর পরিবার ঢাকায় বসবাস করে এবং প্রেমতলীতে তাদের নিজস্ব কোনো বাড়িও নেই। ৫ই আগস্টের পর ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুরো অঞ্চলে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে এহসানুল কবির টুকুর ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল এবং ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এই সমস্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্তে প্রশাসনের জরুরি ও যৌথ হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।