সুন্দরবনের কয়রা এলাকায় কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযানে কুখ্যাত বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র প্রধান রবিউল ইসলাম (৫০) গুলিবিনিময়ের পর আহত অবস্থায় আটক হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কয়রা টহল ফাঁড়ির আওতাধীন ময়দাফেসা খাল এলাকায় এই রুদ্ধশ্বাস অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে।
কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনে বনদস্যু নির্মূলে চলমান ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ডের একটি চৌকস দল ময়দাফেসা খাল এলাকায় পৌঁছালে ওত পেতে থাকা সশস্ত্র বনদস্যুরা কোস্ট গার্ডকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। কোস্ট গার্ডের সদস্যরাও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালালে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র গুলিবিনিময় হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে দস্যু বাহিনীর প্রধান রবিউল ইসলাম গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর জখম হয়ে কোস্ট গার্ডের হাতে আটক হন।
খুলনা মেডিকেলে চিকিৎসা ও কোস্ট গার্ড হেফাজত: শুক্রবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটের দিকে গুলিবিদ্ধ দস্যু প্রধান রবিউলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম লক্ষ্য করা গেছে। হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের পরপরই তাঁকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কোস্ট গার্ডের নিজস্ব হেফাজতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ইলিয়াস বাহিনীর সাবেক ভগ্নিপতি এই ‘দুলাভাই’: স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুন্দরবনের কুখ্যাত ইলিয়াস বাহিনীর প্রধান নিহত হওয়ার পর রবিউল ইসলাম অত্যন্ত চতুরতার সাথে দলটি পুনর্গঠন করেন। রবিউল মূলত ইলিয়াস বাহিনীর সাবেক প্রধানের বোনের স্বামী বা ভগ্নিপতি হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এই দলটিকে ‘দুলাভাই বাহিনী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বনদস্যুতার পাশাপাশি চাঁদাবাজি এবং মৎস্যজীবী ও সাধারণ বনজীবীদের অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করে সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় নিজেদের সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল এই চক্রটি।
তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা, সমন্বয়ের অভাব:
এদিকে, দুর্গম বনের ভেতরের এই সফল অভিযানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অফিশিয়াল তথ্যের কিছুটা ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, সুন্দরবনের ভেতরে গুলিবিনিময় ও দস্যু আটকের বিষয়টি তিনি মৌখিকভাবে শুনেছেন। তবে অভিযানটি কোস্ট গার্ডের একক উদ্যোগে পরিচালিত হওয়ায় বিস্তারিত কোনো নথি বা সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো থানায় পৌঁছায়নি। একইভাবে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকেও শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অভিযানে ঠিক কতজন অংশ নিয়েছিলেন কিংবা কোনো ভারী অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে কি না—তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
রবিউল ইসলামের আটকের মধ্য দিয়ে সুন্দরবনের নিরাপত্তা বলয়কে চ্যালেঞ্জ করা একটি সশস্ত্র চক্রের নেটওয়ার্ক সাময়িকভাবে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বনদস্যুতা সম্পূর্ণ নির্মূলে প্রশাসনিক নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং কোস্ট গার্ড ও পুলিশের মধ্যে সমন্বিত যৌথ অভিযান আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বনজীবী ও উপকূলবাসী।