কালান্তর নিউজ ডেস্ক
৫ জুন ২০২৬, ১১:০৩ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ফেসবুকে প্রচারণা, প্রকাশ্যে খুন ও দোয়া চাওয়া: খুলনায় বেপরোয়া ৯ সন্ত্রাসী গ্রুপ

খুলনা নগরের প্রাণকেন্দ্র এবং সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা ডাকবাংলো মোড়। গত ৪ মার্চ সবার চোখের সামনে সেখানে রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। খুনিরা বীরদর্পে এলাকা ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু কেউ বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি। শুধু ডাকবাংলো মোড়ই নয়, গত ২ জুন লবণচরা থানা এলাকার সাচিবুনিয়া স্কুলভিটা এলাকায় কাজী রাশিদুল ইসলাম নামের এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

খুলনা জেলা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন নামের দুজনকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার পর পুলিশের ক্রাইম সিনের চিত্র।
খুলনা জেলা জজ আদালতের প্রধান ফটকের বাইরে দুজনকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। —ছবি: কালান্তর নিউজ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি ২০২৬ বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই খুলনা মহানগর ও জেলায় প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা ও জখমের ৩৬টি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। আর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ২২ মাসে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক ও অপরাধজগতের বিরোধে দুই শতাধিক মানুষ খুনের শিকার হয়েছেন। যার নেপথ্যে রয়েছে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও পূর্বশত্রুতা।

খুলনায় সক্রিয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ ও গ্যাং কালচারের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ফিচার ছবি।
প্রাণ বাঁচাতে একটি শোরুমে ঢুকলে সেখানেই শ্রমিক দল নেতা মাসুম বিল্লাহকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। খুলনা নগরের ডাকবাংলো মোড় এলাকায়। —ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

খুলনা কাঁপাচ্ছে যে ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ:

স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, খুলনার অপরাধজগতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে প্রধানত ৯টি গ্যাং বা সন্ত্রাসী গ্রুপ। এগুলো হলো—

১. রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘বি-কোম্পানি’

২. শেখ পলাশের ‘পলাশ গ্রুপ’

৩. হুমায়ুন কবীরের ‘হুমা বাহিনী’

৪. কিশোর গ্যাং থেকে উঠে আসা ‘আশিক বাহিনী’

৫. টুটপাড়া এলাকার ‘নূর আজিম গ্রুপ’

৬. ‘টেংকি শাওন গ্রুপ’

৭. দেয়ানা এলাকার ‘আরমান গ্রুপ’

৮. জিন্নাহপাড়া এলাকার ‘শাকিল গ্রুপ’

৯. দেয়ানা ও তেলিগাতি এলাকার ‘নসিম গ্রুপ’

খুলনার সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও অন্যান্য সামগ্রী।
খুলনায় গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে অভিযানের পর উদ্ধার করা হয়েছে একটি ওয়ান শুটারগান, কয়েক রাউন্ড গুলি ও কয়েকটি দেশের মুদ্রা। —ছবি: সংগৃহীত

দাউদ ইব্রাহিমের অনুকরণে ‘বি-কোম্পানি’ ও ‘নবাব’:

খুলনার অপরাধজগতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নাম রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’। ২০০৪ সালে খুলনা সিটির তৎকালীন মেয়রের গাড়িতে গ্রেনেড হামলার পর তাঁর নামের সাথে ‘গ্রেনেড’ শব্দটি যুক্ত হয়। মুম্বাইয়ের কুখ্যাত ডন দাউদ ইব্রাহিমের ‘ডি-কোম্পানি’র অনুকরণে তিনি নিজের বাহিনীর নাম দিয়েছেন ‘বি-কোম্পানি’ এবং নিজেকে ‘নবাব’ পরিচয় দিয়ে বর্তমানে বিদেশ থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন।

বি-কোম্পানির কয়েক শ সদস্যের একটি বড় অংশই ‘কিশোর গ্যাং’। এই গ্যাংয়ের শুটার, মোটরসাইকেল বাহিনী ও মাদক বিক্রেতাদের মাসে ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়মিত বেতন দেওয়া হয় বলেও চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

কারাগার থেকে রাজপথ: বাবু-পলাশ দ্বন্দ্ব:

গ্রেনেড বাবুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শেখ পলাশ। গত ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১০ সহযোগী ও অস্ত্রসহ পলাশ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাবু আবার অপরাধজগতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। গত ৩০ নভেম্বর আদালত চত্বরে যে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, তাঁরা পলাশের অনুসারী ছিলেন। এই দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব এতটাই তীব্র যে, গত বছরের ১৭ অক্টোবর খুলনা কারাগারের ভেতরেই দুই গ্রুপ ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল।

ফেসবুকে খুনের হুমকি ও কথিত সামাজিকতা:

এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো এখন এতটাই বেপরোয়া যে, ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ১৩টি আইডি ও পেজ খুলে তারা প্রকাশ্য প্রচারণা চালায়। প্রতিপক্ষকে খুনের হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তারা গরিবদের মাঝে ইফতার সামগ্রী, ঈদসামগ্রী বা তীব্র গরমে শিববাড়ী মোড়ে শরবত ও পানি বিতরণ করে সেই ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে। আর এসব প্রচারণায় তাদের সিগনেচার ডায়ালগ থাকে—‘দোয়া মে ইয়াদ রাখনা’ (দোয়ায় মনে রাখবেন)।

খুন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে (পরিসংখ্যান):

পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, খুলনায় খুনের গ্রাফ প্রতি বছরই ঊর্ধ্বমুখী:

খুলনা মহানগরী: ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৪টি এবং ২০২৬ সালের প্রথম ৫ মাসেই ১৬টি খুন হয়েছে।

খুলনা জেলা: ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি, ২০২৫ সালে ৪৯টি এবং ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ২০টি খুনের মামলা হয়েছে।

এমনকি গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পরও খুনোখুনি থামেনি। গত পাঁচ মাসে কোনো কোনো থানায় মামলা কম হলেও স্থানীয়দের দাবি, “ভয়ের সংস্কৃতির” কারণে মানুষ মামলা করতে বা সাক্ষী দিতে সাহস পাচ্ছে না। সিসিটিভি ফুটেজে চোখের সামনে খুন হতে দেখলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলা নিষেধ।’

অস্ত্রের জোগান ও ভাড়ায় খাটছে ঢাকার অপরাধজগতে:

খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘ভঙ্গুর’ উল্লেখ করে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম (মনা) এবং সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নেই, কিশোর গ্যাং ও মাদক সিন্ডিকেট পুরো শহর গ্রাস করছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগরের আমির মাহফুজুর রহমান বলেন, গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলেই সন্ত্রাসীরা বিরিয়ানির প্যাকেট আর পানি বিতরণ করে অপরাধ আড়াল করার সুযোগ পাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, খুলনার এই বি-কোম্পানি বা আন্ডারগ্রাউন্ডের সন্ত্রাসীরা এখন ঢাকা, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় গিয়েও টাকার বিনিময়ে ‘ভাড়ায় খাটছে’। গত মার্চে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় রাকিবুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডে খুলনার বি-কোম্পানির শুটারদের সম্পৃক্ততা পেয়েছিল ডিএমপি। সীমান্ত পার হয়ে আসা অবৈধ অস্ত্রের বড় ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে খুলনা।

 

ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া রাকিবুল ইসলামের প্রোফাইল ছবি।
গত মার্চে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় রাকিবুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় খুলনার সন্ত্রাসীদের ভাড়া করা হয়েছিল বলে ডিএমপির তদন্তে উঠে এসেছে। —ছবি: রাকিবুল ইসলামের ফেসবুক থেকে নেওয়া

খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান সক্ষমতার কিছুটা ঘাটতির কথা স্বীকার করে বলেন, খুনের ঘটনাগুলোর সাথে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং পুলিশ খবর পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে সুশীল সমাজ ও স্থানীয়দের অভিযোগ— পুলিশের ভেতরেও সন্ত্রাসীদের ‘ইনফরমার’ বা তথ্যদাতা থাকায় অনেক সময় অভিযানের আগেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর খুলনাবাসী যে স্বস্তি পেয়েছিল, ২০২৪ সালের পর তা হারিয়ে খুলনা এখন আবার এক ‘নীরব আতঙ্কের শহর’-এ পরিণত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ: খুলনায় জাতীয় ছাত্রশক্তির সংগঠক ফাহিম মিয়া স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত

১

Nouveau casino en ligne : les limites et les règles de jeu responsable

২

Spotify Review 2026

৩

গঙ্গাচড়ায় ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ, কঠোর হুঁশিয়ারি

৪

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শিবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ

৫

রাজশাহীতে চোরাই ল্যাপটপ ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

৬

শতবর্ষী বিদ্যালয়ের মাঠে ড্রেন নির্মাণ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

৭

ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল

৮

মাদ্রাসা শিক্ষককে পেটানোই সমাধান নয়, অপরাধীর পরিচয় ধর্ম নয়, অপরাধীই: সাম্প্রদায়িক ট্যাগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ

৯

রাজশাহীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে, পুনর্বাসিত হবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

১০

নোবিপ্রবিতে নবীনবরণ ৭ নভেম্বর, থাকছেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা

১১

তাড়াইলে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট, ২ হাজার ৬০০ টাকাতেও মিলছে না সিলিন্ডার

১২

বাঘারপাড়ার জহুরপুরে ২০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, প্রকৃতির অনন্য তোরণ

১৩

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ পালিত: আলোচনা সভা ও মানববন্ধন

১৪

ডিপিসি সম্পন্ন, তবু পদোন্নতির জিও নেই: অপেক্ষায় ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার

১৫

নবীনগরে গাছের চারা লাগানো নিয়ে বিরোধ, বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৬

সুন্দরবনে জাহাজের ধাক্কায় ডুবল কয়লাবাহী কার্গো, তলিয়ে গেল ১,২৫০ টন কয়লা

১৭

মিরসরাইয়ের নতুন ইউএনও মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জনসেবায় বাড়ছে প্রত্যাশা

১৮

নির্বাচন কমিশনকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় জোটের

১৯

টঙ্গীর শিশু নিপীড়ন বিতর্কে নতুন মোড়, দেশ ছাড়ার দাবি শিশুটির বাবার

২০