পবিত্র জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা এবং ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সাধারণ মুসলমানদের মনে ‘আরাফার রোজা’র তারিখ নিয়ে প্রতি বছরই নানা প্রশ্ন জাগে। এই বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের সঠিক বিধান এবং বিভ্রান্তি দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক।
সম্প্রতি জাতীয় মসজিদে জুমার খুতবাপূর্ব বয়ানে তিনি স্পষ্ট করেন যে, আরাফার রোজার সময়কালকে আরাফাতের ময়দানে হাজিদের অবস্থানের সময়ের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। এই রোজার সম্পর্ক মূলত তারিখের (৯ জিলহজের) সাথে। নিজ নিজ দেশে যখন ৯ জিলহজ পড়বে, তখনই এই রোজা রাখতে হবে।
হাজিদের জন্য নয়, রোজা সাধারণ মুসলমানদের জন্য:
মুফতি আব্দুল মালেক বলেন, ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, আরাফার রোজা (৯ জিলহজ) হজ পালনকারীদের জন্য সুন্নত নয়। বিদায় হজের সময় আরাফাতের ময়দানে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা অবস্থায় আছেন কি না, তা নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছিল। এই সংশয় দূর করতে নবীজি (সা.)-এর সামনে এক পেয়ালা দুধ পেশ করা হলে তিনি সবার সামনে তা পান করেন। ইমাম বুখারি (রহ.) সংকলিত ‘সহিহ বুখারি’র এই হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, বিদায় হজের দিন নবীজি (সা.) রোজা রাখেননি।
খতিব উল্লেখ করেন, হজ পালনকারীদের জন্য সুন্নত হলো আরাফার দিন রোজা না রাখা, যাতে তারা পূর্ণ শক্তি নিয়ে হজের মূল ইবাদত সম্পন্ন করতে পারেন। তবে কোনো হাজি যদি মনে করেন রোজা রাখলে তাঁর শারীরিক সমস্যা হবে না, তবে তাঁর জন্য রোজা রাখা জায়েজ। মূলত, আরাফার দিনের এই রোজার সুন্নতি বিধানটি হাজিদের ছাড়া বাকি পৃথিবীর সাধারণ মুসলমানদের জন্য। যারা দ্বিধায় ভোগেন, তারা চাইলে ৮ ও ৯ জিলহজ মিলিয়ে দুটি রোজা রাখতে পারেন।
জিলহজের প্রথম ১০ দিনের বিশেষ গুরুত্ব:
খতিব মুফতি আব্দুল মালেক বলেন, পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ইবাদত-বন্দেগির জন্য জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সময় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে জিলহজের এই দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে বেশি প্রিয় ও আফজাল (উত্তম) অন্য কোনো দিনের আমল নয়। এমনকি আল্লাহর রাস্তায় সাধারণ জিহাদও এর চেয়ে উত্তম নয়, কেবল সেই শহীদ ব্যক্তি ছাড়া যিনি জান-মাল নিয়ে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি।
এই দশকের করণীয় নেক আমলসমূহ:
এই পুণ্যময় দিনগুলোতে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য খতিব বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেন:
নফল রোজা: ১ জিলহজ থেকে শুরু করে ৯ জিলহজ পর্যন্ত একটানা নয় দিন নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ (১০ জিলহজ ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম)। কেউ চাইলে নিজের সুবিধা অনুযায়ী কিছু দিন রোজা রাখতে ও কিছু দিন ছেড়ে দিতে পারেন।
রাত জেগে ইবাদত: রমজানের শেষ দশকের মতো জিলহজের এই দশ রাতেও যতটুকু সম্ভব কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরিফ, ইস্তেগফার এবং দীর্ঘ কেরাতে নফল ও তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া উচিত।
আউয়াবিন ও সদকা: মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে আউয়াবিনের নামাজ একটু বেশি পড়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী নফল সদকা ও দান-খয়রাত করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।