কালান্তর নিউজ ডেস্ক
২২ মে ২০২৬, ১০:২৮ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

পল্লবীতে শিশু হত্যা: ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন এখন সময়ের দাবি

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল আমাদের সমাজে কন্যাশিশুরা কতটা অনিরাপদ ও অরক্ষিত। শিশুটির ওপর ঘটে যাওয়া এই চরম বর্বরতা পুরো বিবেকবান সমাজকে বাক্‌রুদ্ধ করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম অবনতি আর বিচারহীনতার দীর্ঘ সংস্কৃতি সামগ্রিক পরিস্থিতিকে এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে—ঘরে কিংবা বাইরে নারী ও শিশুরা আদৌ কোথাও নিরাপদ কি না, সেটাই এখন নাগরিকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সন্তান হারানো শোকার্ত বাবার গণমাধ্যমে দেওয়া সেই আকুতি, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না”—আজ বৃহত্তর অর্থে দেশের কোটি ক্ষুব্ধ নাগরিকের ক্ষোভ ও আস্থাহীনতারই প্রতিধ্বনি। ফলে এখন শুধু একটি মামলার দৃষ্টান্তমূলক বিচার করাই শেষ কথা নয়, বরং সরকার ও রাষ্ট্রের প্রধান গুরুদায়িত্ব হচ্ছে বিচারব্যবস্থা নিয়ে নাগরিকদের মনে যে গুরুতর আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা অনতিবিলম্বে নিরসন করা।

ঘটনার ভয়াবহতা ও আইনি তৎপরতা:

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার সকালে পাশের ফ্ল্যাটের এক ভাড়াটের হাতে নির্মম খুনের শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণিপড়ুয়া ওই শিশুটি। শুধু ধর্ষণ ও হত্যাই নয়, অপরাধ গোপন ও লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে মূল অভিযুক্ত শিশুটির মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার অপচেষ্টাও চালিয়েছিল। এই লোমহর্ষক ঘটনায় মূল আসামি সোহেল রানা (৩৪) ইতিমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে এবং অভিযুক্তের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নিখুঁত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিখুঁত চার্জশিট গঠনের মাধ্যমে এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। কারণ, যৌক্তিক সময়ের মধ্যে যথাযথ ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাটাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।

বাছাইকৃত বিচার বনাম সামষ্টিক বিচারহীনতা:

পল্লবীর এই নৃশংস ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও শিশুদের ওপর এমন সহিংসতার চিত্র গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে যেসব ঘটনা তীব্র আলোড়ন তোলে—কেবলমাত্র সেই নির্দিষ্ট মামলার ক্ষেত্রেই প্রশাসন দ্রুত তৎপরতা দেখায়। যেমন, গত ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মাগুরায় আট বছরের এক শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হলে, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত বিচারের অঙ্গীকার করেছিল এবং নিম্ন আদালতে স্বল্পতম সময়ে তার রায়ও হয়েছিল। তবে এভাবে বেছে বেছে কেবল ‘আলোচিত’ মামলার বিচার করার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে সামষ্টিক বিচারহীনতাকেই আড়াল করে রাখে।

গবেষণায় বিচারহীনতার ভয়াবহ চিত্র:

চলতি মে মাসেই সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের চোখের সামনে আইনি ব্যবস্থার নগ্ন রূপ প্রকাশ করেছে। দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার ক্ষেত্রে বিচারহীনতার শিকড় কতটা গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক, তা এই গবেষণায় স্পষ্ট। তথ্য অনুযায়ী—

  • নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় আসামিদের সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ!
  • এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলাতেই আইনি দুর্বলতার সুযোগে খালাস পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।
  • আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির স্পষ্ট বিধান থাকলেও, বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে সময় লাগছে ৩ বছর ৭ মাস।
  • বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত ও প্রমাণ, সঠিক সময়ে সাক্ষীর অনুপস্থিতি এবং কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণেই আজ অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

উপসংহার:

প্রশ্ন জাগে, অপরাধীরা যদি আগে থেকেই জেনে যায় যে নারী ও শিশু নির্যাতন করে পার পাওয়া সম্ভব এবং এখানে শাস্তি হয় না বললেই চলে—তবে পল্লবী কিংবা মাগুরার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে কীভাবে? শুধু আলোচিত ও বাছাই করা কিছু মামলা নয়, দেশের প্রতিটি কোণায় ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি অপরাধের সমান ও নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন মানেই বিচারহীনতা’—এই ভয়ংকর দুষ্টচক্র থেকে রাষ্ট্র ও সরকারকে অনতিবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে।

 

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ: খুলনায় জাতীয় ছাত্রশক্তির সংগঠক ফাহিম মিয়া স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত

১

Nouveau casino en ligne : les limites et les règles de jeu responsable

২

Spotify Review 2026

৩

গঙ্গাচড়ায় ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ, কঠোর হুঁশিয়ারি

৪

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শিবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ

৫

রাজশাহীতে চোরাই ল্যাপটপ ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

৬

শতবর্ষী বিদ্যালয়ের মাঠে ড্রেন নির্মাণ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

৭

ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল

৮

মাদ্রাসা শিক্ষককে পেটানোই সমাধান নয়, অপরাধীর পরিচয় ধর্ম নয়, অপরাধীই: সাম্প্রদায়িক ট্যাগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ

৯

রাজশাহীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে, পুনর্বাসিত হবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

১০

নোবিপ্রবিতে নবীনবরণ ৭ নভেম্বর, থাকছেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা

১১

তাড়াইলে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট, ২ হাজার ৬০০ টাকাতেও মিলছে না সিলিন্ডার

১২

বাঘারপাড়ার জহুরপুরে ২০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, প্রকৃতির অনন্য তোরণ

১৩

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ পালিত: আলোচনা সভা ও মানববন্ধন

১৪

ডিপিসি সম্পন্ন, তবু পদোন্নতির জিও নেই: অপেক্ষায় ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার

১৫

নবীনগরে গাছের চারা লাগানো নিয়ে বিরোধ, বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৬

সুন্দরবনে জাহাজের ধাক্কায় ডুবল কয়লাবাহী কার্গো, তলিয়ে গেল ১,২৫০ টন কয়লা

১৭

মিরসরাইয়ের নতুন ইউএনও মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জনসেবায় বাড়ছে প্রত্যাশা

১৮

নির্বাচন কমিশনকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় জোটের

১৯

টঙ্গীর শিশু নিপীড়ন বিতর্কে নতুন মোড়, দেশ ছাড়ার দাবি শিশুটির বাবার

২০