ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন দেশের ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও ভোক্তা অধিকার প্রতিনিধিরা। তাঁরা এই প্রস্তাবকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের যেকোনো প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের আগে বাধ্যতামূলকভাবে বিইআরসিতে পাঠাতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ক্যাপাসিটি চার্জের (বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া) জন্যই সরকারের ভর্তুকি বেড়েছে এবং জাতির ক্ষতি হয়েছে।”
গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিইআরসি আয়োজিত ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব সংক্রান্ত এক হাই-ভোল্টেজ গণশুনানিতে এসব আলোচনা ও ক্ষোভের চিত্র উঠে আসে।
প্রকল্পের খরচ ভোক্তার ঘাড়ে চাপানোর আপত্তি:
শুনানিতে অংশ নিয়ে ভোক্তারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা হাজার হাজার কোটি টাকার অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেয় এবং পরবর্তীতে সেই খরচ সমন্বয় করতে বিইআরসির কাছে দাম বাড়ানোর আবেদন করে; অথচ এসব প্রকল্পের বিষয়ে কমিশন আগে থেকে কিছুই জানে না।
ভোক্তাদের এই আপত্তির জবাবে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “সব সংস্থা ও কোম্পানিকে ইতিমধ্যে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে যে, প্রকল্প অনুমোদনের আগে বিইআরসিতে পাঠাতে হবে। আগের কমিশন এটা করেনি। অথচ কোনো বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) বিইআরসিকে দেখতে দেওয়া হয়নি।” তিনি আশ্বস্ত করেন, নতুন এই নিয়ম কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হবে।
কোন সংস্থা কত শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে?
শুনানির শুরুতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা বিদ্যমান পাইকারি দাম ধরে ভোক্তা পর্যায়ে একের পর এক দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ও যুক্তি উপস্থাপন করে:
সংস্থাগুলো জানায়, পাইকারি দাম ও সঞ্চালন চার্জ বাড়লে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়াতে হবে। এর আগের দিন বুধবার কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি পিডিবির পাইকারি দাম ও পিজিবি পিএলসির সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর আবেদন মূল্যায়ন করে ইতিবাচক সুপারিশ করেছিল।
দাম বাড়ানোর পক্ষে কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন:
খুচরা দামের প্রস্তাব নিয়ে কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিতরণ সংস্থাগুলোর বড় অংকের ঘাটতি হতে পারে (যেমন: নেসকোর ১ টাকা ৪৩ পয়সা, আরইবির ১ টাকা ৩৯ পয়সা)। এই ঘাটতি মেটাতে হলে ভোক্তা পর্যায়ে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ (ইউনিট প্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা) বাড়াতে হবে।
তবে কারিগরি কমিটি আবাসিক গ্রাহকদের ধাপ বা স্ল্যাব পরিবর্তনের প্রস্তাব এবং গ্রাহকের লোড পরিবর্তনের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল ‘বাণিজ্যিক’ করার প্রস্তাবও বাতিল করা হয়েছে। কমিটি জানায়, এগুলোকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখতে হবে, বাণিজ্যিক করা যাবে না।
শুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “সবার মতামত, প্রস্তাব ও পরামর্শ বিবেচনায় নিয়েই কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে অবশ্যই ভোক্তার স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে।”
ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের ক্ষোভ ও বর্জন:
দাম বাড়ানোর এই গণশুনানি ও প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। লিখিত বক্তব্যে তারা দাম না বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বলে, দাম বাড়লে মাসের খরচ বাড়ার পাশাপাশি সব ধরনের দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে।
শুনানিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়ে বলেন, “বিদ্যুৎ সেবা খাত, এটি লাভজনক ব্যবসা নয়। মানুষের পকেট কাটার এই প্রস্তাব অনৈতিক।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সংকটের অজুহাত না দেখিয়ে কেন ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো বা দাম কমানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সাংবাদিক শুভ কিব্রিয়া বলেন, “সরকার মুনাফাভোগী হতে পারে না। লুটপাটের বাংলাদেশ থেকে বের হয়ে এখন দাম কমানোর গণশুনানি করতে হবে।”
এদিকে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ৭ দফা লিখিত দাবি জমা দিয়ে জানিয়েছে, ২০২০ সাল থেকে ইস্পাত বা স্টিল খাতে চরম মন্দা চলছে। এখন আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ালে এই ভারী শিল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাঁরা ধাপে ধাপে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানান।