পবিত্র ইসলাম ধর্মে পারস্পরিক সম্পর্ককে সুন্দর ও সুদৃঢ় করতে সামাজিক শিষ্টাচার এবং আচার-ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় আমাদের ছোট ছোট অসচেতন আচরণও অন্যের মনে গভীর কষ্টের কারণ হতে পারে। এমনই একটি সামাজিক ব্যাধি হলো আড্ডা বা বৈঠকে বসে একজনকে বাদ দিয়ে অন্য দুজনের গোপনে বা কানে কানে কথা বলা। এ ধরণের আচরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
তৃতীয় ব্যক্তি একা ও নিঃসঙ্গ বোধ করে:
ইসলামিক স্কলারদের মতে, কোনো বৈঠকে তিনজন একসঙ্গে থাকা অবস্থায় যদি একজনকে পাশ কাটিয়ে বাকি দুজন পরস্পর কানাঘুষা বা ফিসফিস করে, তবে তৃতীয় ব্যক্তি নিজেকে তুচ্ছ বা অনুপ্রবেশকারী মনে করতে পারে। এই আচরণ তাকে চিন্তিত, একা ও নিঃসঙ্গ করে তোলে, যা তাকে মনে কষ্ট দেয়। আর কোনো মুমিন বা মানুষকে অনর্থক কষ্ট দেওয়া ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না।
হাদিসের অকাট্য নির্দেশনা:
প্রিয় নবী (সা.) এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। হাদিসে এরশাদ হয়েছে:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোথাও তোমরা তিনজন থাকো, তখন একজনকে বাদ দিয়ে দুজনে কানে কানে কথা বলবে না। এতে তার মনে দুঃখ হবে। তবে তোমরা মানুষের মধ্যে মিশে গেলে তা করতে দোষ নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৩২)
অন্য এক হাদিসে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে বলা হয়েছে যে, কাউকে কষ্ট দেওয়া আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। নবিজি (সা.) বলেন:
“একজনকে বাদ রেখে দুজন পরস্পর আলাপে লিপ্ত হবে না। কারণ এতে তার মনে কষ্ট লাগবে। আর মুমিনকে কষ্ট দেওয়া আল্লাহ তাআলার পছন্দ নয়।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৮২৫)
চারজন থাকলে কি কানাকানি করা যাবে?
বৈঠকে চার বা তার বেশি মানুষ থাকলে এই নিয়মের কিছুটা শিথিলতা রয়েছে। বিখ্যাত সাহাবি হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি যখন নবিজি (সা.)-এর এই নিষেধাজ্ঞা বর্ণনা করছিলেন, তখন বর্ণনাকারী আবু সালেহ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন—যদি সেখানে চারজন থাকে? উত্তরে ইবনে উমর (রা.) বললেন, “তাহলে সমস্যা নেই।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৫২)। কারণ, চারজন থাকলে বাকি দুজন কথা বললেও অন্যজন একা হয়ে পড়ে না, তার সাথে কথা বলার মতো আরেকজন মানুষ থাকে।
পবিত্র কোরআনেও আমাদের মুখের প্রতিটি কথার হিসাব রাখার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “যে কথাই মানুষ উচ্চারণ করে (তা সংরক্ষণের জন্য) তার কাছে একজন সদা তৎপর প্রহরী আছে।” (সুরা কাফ, আয়াত: ১৮)। একই সাথে সুরা বাকারার ৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, “আর তোমরা লোকের সঙ্গে উত্তমভাবে কথা বলবে।”
তাই সামাজিক আড্ডা, পরিবার বা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অজান্তেই যাতে কাউকে ছোট বা একাকী করে না ফেলি, সে বিষয়ে আমাদের সদা সতর্ক থাকা উচিত।