কালান্তর নিউজ ডেস্ক
২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

প্লাস্টিকের কাছে হার মানছে বাঁশের শিল্প, বিলুপ্তির পথে কারিগরদের জীবন

একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছিল বাঁশঝাড়। বাড়ির আঙিনায় বসে নারী-পুরুষ মিলে তৈরি করতেন কুলা, ডালা, চালুনি, ঝুড়ি, মোড়া, চাটাইসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। শুধু গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটানোই নয়, এসব পণ্য তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন অসংখ্য পরিবার। গ্রামীণ অর্থনীতি ও লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাঁশ-বেতের এই কুটিরশিল্প।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সস্তা প্লাস্টিক ও মেলামাইনের পণ্যের দাপটে সংকুচিত হয়ে পড়েছে বাঁশ-বেতের বাজার। ফলে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন অনেক কারিগর। যারা এখনো টিকে আছেন, তাদের অনেকেই বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কাঁধে রঙিন ঝুড়ির বোঝা নিয়ে পথে পথে ঘুরে পণ্য বিক্রি করা ৬৫ বছরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ যেন সেই হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

বিলুপ্তির পথে দেশীয় কুটিরশিল্প

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের মধ্যে বাঁশ ও বেতশিল্প অন্যতম। একসময় এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল অসংখ্য পরিবার। বাঁশ দিয়ে তৈরি হতো ঝুড়ি, ডালা, কুলা, চালুনি, চাটাই, মোড়া, মাছ ধরার চাঁই, খলুই ও পলো। পাশাপাশি মৃৎশিল্প, শঙ্খ ও ঝিনুকশিল্প, কাঁসা-পিতলশিল্প এবং হস্তচালিত তাঁতশিল্পও দেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে আধুনিকতার প্রভাব, বাজার সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এসব শিল্পের অনেকগুলোই এখন অস্তিত্বের সংকটে।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ-বেতশিল্প?

কারিগর ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ শিল্পের সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে।

প্রথমত, কাঁচামালের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। একসময় যে বাঁশ ৫০ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, বর্তমানে সেটির দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ থাকছে না।

দ্বিতীয়ত, প্লাস্টিকের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বাঁশের কারিগররা। বাজারে একটি প্লাস্টিকের ডালা যেখানে প্রায় ৮০ টাকায় পাওয়া যায়, সেখানে বাঁশের তৈরি একই ধরনের ডালার দাম প্রায় ২৫০ টাকা। দাম বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতাই বাঁশের পণ্যের পরিবর্তে প্লাস্টিকের পণ্য বেছে নিচ্ছেন।

তৃতীয়ত, এ পেশায় শ্রম ও সময় বেশি লাগলেও আয় তুলনামূলক কম। সাতক্ষীরার দেবহাটার কারিগর বিশ্বনাথ দাসের উদাহরণ দিয়ে জানা যায়, একটি ঝুড়ি ১৫০ টাকায় বিক্রি করে কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচ বাদে খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে। সারাদিনে দুটি ঝুড়ি তৈরি করেও সংসারের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।

জীবিকার তাগিদে কঠিন সংগ্রাম

একসময় বাঁশ-বেতের কাজ করে স্বচ্ছলভাবে সংসার চালাতেন অনেক কারিগর। কিন্তু বর্তমানে বাজার সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তাদের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।

রংপুর বিভাগের বাঁশ-বেতশিল্প নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে একসময় প্রায় ৭০ হাজার পরিবারের সম্পৃক্ততার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার পরিবারের টিকে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। অনেক কারিগর পুঁজি সংকটে এনজিও থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ঋণের কিস্তি ও সুদের চাপ তাদের আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জামালপুরের প্রবীণ কারিগর রানা পাল বলেন, “আগে এই কাজ করেই সংসারের সব খরচ চলত। এখন আগের মতো বিক্রি নেই। নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আগ্রহী নয়।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কারিগরদেরও একই ধরনের অভিজ্ঞতা। তাদের ভাষ্য, জীবিকার তাগিদে যারা এখনো এ পেশায় রয়েছেন, তাদের অনেকেই আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বাঁশ-বেতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু ঐতিহ্যের কথা বললেই হবে না, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

১. সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণ: বিসিকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কারিগরদের বিনা সুদে বা স্বল্প সুদে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা।

২. আধুনিক নকশায় পণ্য তৈরি: প্রচলিত ঝুড়ি, ডালা ও কুলার পাশাপাশি বাঁশ দিয়ে টেবিল ল্যাম্প, ঝাড়বাতি, মোবাইল স্ট্যান্ড, ঘর সাজানোর সামগ্রীসহ আধুনিক পণ্য তৈরি করা।

৩. দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ: সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মেলা ও বিভিন্ন আয়োজনে পরিবেশবান্ধব বাঁশ-বেতের পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো।

৪. অনলাইন বিপণন: ফেসবুক, ই-কমার্স ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পণ্যের প্রচার ও বিক্রির ব্যবস্থা করা। এতে স্থানীয় বাজারের বাইরেও ক্রেতা পাওয়া সম্ভব হবে।

৫. ক্রেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবেশবান্ধব ও দেশীয় ঐতিহ্যের পণ্য ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করা। সামান্য বেশি দাম হলেও বাঁশ-বেতের পণ্য কেনার মাধ্যমে কারিগরদের জীবিকা রক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব।

শেষ প্রজন্মের কাঁধে ঐতিহ্যের বোঝা

কাঁধে রঙিন ঝুড়ির বোঝা নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ানো প্রবীণ কারিগরদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, শুধু একটি পেশা নয়, হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি ও জীবনধারা।

যে হাতে একসময় তৈরি হতো সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সেই হাত আজ বয়সের ভারে ধীর হয়ে এসেছে। নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ আর বাজারের প্রতিযোগিতায় এ শিল্পের ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হয়তো একসময় বাঁশ-বেতের এসব পণ্য শুধু স্মৃতি, ছবি কিংবা জাদুঘরের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। তাই ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি হাজারো কারিগরের জীবিকা বাঁচাতে সরকার, ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্লাস্টিকের কাছে হার মানছে বাঁশের শিল্প, বিলুপ্তির পথে কারিগরদের জীবন

১

নড়াইলে সাবেক শিক্ষকের বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি, লুট নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার

২

যাচ্ছিস না কেন প্র্যাকটিসে?’ মা জানেন না, মেয়ে কেন ১৮ বছর বয়সে ক্রিকেট ছেড়েছিল

৩

মামার আশ্রয়ে থেকে সেই মামার বাড়িই দখলের চেষ্টা, গাছ কাটার অভিযোগ ভাগিনার বিরুদ্ধে

৪

বোয়ালখালীতে ট্রেনের সঙ্গে প্রাইভেট কারের সংঘর্ষ, আহত চালক; অক্ষত একই পরিবারের তিনজন

৫

শ্যামনগরে থামছে না সড়ক দুর্ঘটনা, দেড় মাসের ব্যবধানে আবারও প্রাণ গেল বাসের ধাক্কায়

৬

ছয়ফুল্লাকান্দিতে ১২০ পিস ইয়াবাসহ নারী গ্রেপ্তার

৭

হাতীবান্ধার মোকাদ্দেস নগরে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মানববন্ধন

৮

বাপাজসের গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন নোবিপ্রবির ইফতেখার হোসাইন

৯

খুলনার বৃহত্তম পুরাতন সাইকেলের হাট শাহপুরে, জমজমাট বৃহস্পতিবার

১০

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১১

গাড়ি থামিয়ে টাকা দাবির অভিযোগ, মীমাংসায় গিয়ে পুলিশের ধাক্কার শিকার বিএনপি নেতা!

১২

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা-দাফনে বাধার প্রতিবাদে মিরসরাইয়ে মানববন্ধন

১৩

বড়ভিটা ফাজিল মাদ্রাসায় নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি নথিতে পাঁচজনের নাম

১৪

শিববাড়ি মোড় নয়, বিকল্প ভেন্যুতে সমাবেশ চান খুলনাবাসী

১৫

ছেলের এইচএসসি পাসের পোস্ট ঘিরে বিতর্ক, বিলুপ্ত চুয়াডাঙ্গা জেলা ছাত্রদল কমিটি

১৬

রাজশাহীতে ১৬ বছরের কিশোরী নিখোঁজ, সন্ধান চায় পরিবার!

১৭

অ্যাম্বুলেন্সে ইয়াবা পাচার, ১৭ লাখ টাকার মাদকসহ আটক ২

১৮

মিরসরাইয়ের মাঠ কাঁপানো কণ্ঠ সাইদুল ইসলাম, ধারাভাষ্যে মুগ্ধ হাজারো দর্শক

১৯

সবুজ বাংলা উত্তাল কলমেঃ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান

২০