টঙ্গীর এক মাদ্রাসায় ৭ বছরের শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে, আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছে। আইন তার গতিতে চলছে।
কিন্তু এর বাইরে যে ঘটনাটি ঘটলো সেটা ভয়ংকর — অভিযুক্তকে প্রকাশ্যেই শারীরিকভাবে নিগৃহীত করা, ভিডিও করে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
আমরা এই মব-জাস্টিসের তীব্র প্রতিবাদ জানাই।
অন্যায়ের দায় অন্যায়কারীর, কোনো ধর্মের না, কোনো পোশাকের না, কোনো প্রতিষ্ঠানের না। যদি একজন টুপি পরা মানুষ অপরাধ করে, তার দায় টুপির নয়। যদি একজন ক্লিনশেভ মানুষ অপরাধ করে, তার দায় দাড়ি কামানোর নয়।
প্রশ্ন করি- সমাজের কোন জায়গায় ব্যভিচার নেই?
তথ্য-উপাত্ত হাতে নিয়েই বলছি, শুধু মাদ্রাসায় চোখ রাখলে চলবে না, চোখ রাখুন পুরো সমাজে:
১. ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ:এই দেশের সবচেয়ে অভিজাত গার্লস স্কুল। ২০২৪ সালে আজিমপুর শাখার গণিত শিক্ষক মুরাদ হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রমাণ পেয়েছে ডিএমপি। তার মোবাইল-ল্যাপটপে অশ্লীল চ্যাটের প্রমাণ মিলেছে।
এর আগে ২০১১ সালে একই প্রতিষ্ঠানের বসুন্ধরা শাখার বাংলা শিক্ষক পরিমল জয়ধর দশম শ্রেণির ছাত্রীকে কোচিং সেন্টারে দুইবার ধর্ষণ করে যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছে। তখন কি আমরা বলেছিলাম স্কুল বন্ধ করে দাও?
২. হলি ক্রস কলেজ: রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী এই কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অনিমেষ সাহার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ উঠেছে? একাদশ শ্রেণির ছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ, গর্ভধারণ এবং জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর গুরুতর অভিযোগ।
সামাজিক মাধ্যমে ২০ জনের বেশি প্রাক্তন ছাত্রী তার বিরুদ্ধে ২০ বছর ধরে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণের অভিযোগ এনেছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি করতে বাধ্য হয়েছে। তখন কি আমরা বলেছিলাম খ্রিস্টান মিশনারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দাও?
৩. ইডেন, বদরুন্নেসা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ইডেন মহিলা কলেজে ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে পানি সরবরাহকর্মী আটক হলো মাত্র গতকাল (২৬ অক্টোবর ২০২৬)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, হলি ফ্যামিলি মেডিকেলসহ সারা দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির ঘটনা রুটিন হয়ে গেছে।
তাহলে কেন শুধু মাদ্রাসার একজন শিক্ষক অপরাধ করলে পুরো মাদ্রাসা সমাজকে, দাড়ি-টুপিকে, ইসলামকে গালি দিতে হবে? এটা পরিষ্কার সাম্প্রদায়িক উসকানি।
আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার খ মহিদ উদ্দিন ভিকারুননিসার ঘটনায় বলেছিলেন — ব্যক্তির দায় ব্যক্তির। একজন শিক্ষক যদি বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কাজ করে থাকেন, তার দায় অন্য শিক্ষকরা নেবে না।এই কথাটাই আজকের বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় আইন।
আমাদের দাবি স্পষ্ট:
১. টঙ্গীর অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকের দ্রুত, নিরপেক্ষ বিচার হোক, যদি প্রমাণিত হয় সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। একই সাথে তাকে প্রকাশ্যে পেটানো এবং মাদ্রাসায় হামলা-ভাঙচুর ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
২. কোনো অপরাধীকে তার ধর্মীয় পরিচয়ে বিচার করা যাবে না। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিচার করতে হবে।
৩. ভিকারুননিসার পরিমল, মুরাদ, হলি ক্রসের অনিমেষ — সবার ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ডে বিচার হতে হবে। একজনের জন্য পুরো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করার এই নোংরা খেলা বন্ধ করতে হবে।
সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশই আমাদের লক্ষ্য। মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় — সব জায়গায় শিশুরা নিরাপদ থাকুক, অপরাধী যেই হোক সে শাস্তি পাক। কিন্তু অপরাধকে পুঁজি করে ধর্মকে টার্গেট করার যে ঘৃণ্য রাজনীতি, তার বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠ কঠোর, ঝাঁঝালো এবং আপসহীন।