একটি গরুও নেই, গোয়ালঘরেও নেই গবাদিপশু। অথচ প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ দুধ। এমন অসংগতির সূত্র ধরে সামনে এসেছে ভেজাল দুধ তৈরির একটি চক্রের তথ্য। দুধের নামে এসব পণ্য বাজারজাত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, একটি চক্র কৃত্রিম উপায়ে দুধ তৈরিতে ব্যবহার করে প্লাস্টিকের ড্রাম, পাউডার দুধ, পাম অয়েল, চিনি, জেলিজাতীয় পদার্থ, কৃত্রিম দুধের ফ্লেভার এবং পানি। এ ছাড়া হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
দুধের মতো ঘনত্ব ও চেহারা তৈরি করে ক্রেতাদের কাছে এসব পণ্য বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ। দুধের ঘনত্ব মাপার ল্যাক্টোমিটার ব্যবহার করেও ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হতে পারে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চক্রটি দুইভাবে দুধ বিক্রি করে। পরিচিত কিছু ক্রেতার কাছে সরাসরি দুধ সরবরাহের পাশাপাশি অন্য বিক্রেতাদের কাছে পাইকারি দরে পণ্য বিক্রি করা হয়। পরে এসব বিক্রেতা বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে গিয়ে দুধ সরবরাহ করেন।
এভাবে উৎপাদনকারী থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত একাধিক ধাপে পণ্য পৌঁছালে প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই সরবরাহব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি পাবনার ফরিদপুরে ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালায়। অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা, একজনকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং একটি ডেইরি ফার্ম সিলগালা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় জেলিজাতীয় পদার্থ, পাম অয়েলের ড্রাম, ব্লেন্ডার মেশিন ও প্রস্তুত করা নকল দুধ জব্দ করে ধ্বংস করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনির বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে অভিযানের তারিখ, মামলার বিবরণ ও কর্মকর্তার বক্তব্যের সত্যতা প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
দুধে অননুমোদিত রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড খাদ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত না হলে তা গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। এর সংস্পর্শে আসার মাত্রা ও ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে মুখ, গলা, পাকস্থলী ও অন্ত্রে ক্ষতি হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতে নির্দিষ্ট রাসায়নিকের ধরন, ঘনত্ব এবং গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনা করা জরুরি। তাই পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের উপাদান বা ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
শিশুদের জন্য দুধ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস হওয়ায় নিরাপদ ও মানসম্মত দুধ নিশ্চিত করা বিশেষভাবে জরুরি।
খুলনার বিভিন্ন এলাকায় ভ্যান কিংবা বাসাবাড়িতে গিয়ে দুধ বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে শুধু ভ্যানে দুধ বিক্রি করা, কম দাম রাখা কিংবা বিক্রেতার নিজস্ব গোয়ালঘর না থাকাকে ভেজাল দুধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
ক্রেতাদের উচিত বিশ্বস্ত উৎস থেকে দুধ কেনা এবং সন্দেহজনক পণ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো। শুধু গন্ধ, স্বাদ, রং কিংবা ঘনত্ব দেখে দুধ খাঁটি কি না, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে অনুমোদিত পরীক্ষাগারে দুধ পরীক্ষা করানো উচিত।
সন্দেহজনক খাদ্যপণ্য বিক্রির বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১-এ অভিযোগ জানানো যেতে পারে।
দুধ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই দুধে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নমুনা পরীক্ষা, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং দুধ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।