রাজধানীর যানজট নিরসনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা জোরালো হয়ে উঠেছে। তবে নগরবাসীর প্রতিদিনের ভোগান্তির বাস্তব চিত্র বলছে—ঢাকার এই দীর্ঘদিনের যানজটের পেছনে কেবল অটোরিকশা নয়, বরং একাধিক জটিল কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। অনিয়ন্ত্রিত থ্রি-হুইলার চলাচলের পাশাপাশি ফুটপাত ও সড়ক দখল, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণও এই পরিস্থিতির জন্য সমানভাবে দায়ী।
২০২৬ সালের মার্চে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বিত যানজট নিরসন উদ্যোগে ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করা, ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রিকশাকে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও স্বীকার করেছে যে ঢাকার যানজট একটি বহুমাত্রিক সমস্যা।
অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়েও সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়কে এসব যানবাহনের অবাধ চলাচল, ট্রাফিক আইন না মানা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং যানজট সৃষ্টির চিত্র উঠে এসেছে। অথচ প্রচলিত সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী রাজধানীর প্রধান সড়কে এসব থ্রি-হুইলার চলাচলের কোনো অনুমতি নেই।
তবে প্রশ্ন উঠছে—শুধু অটোরিকশা সরিয়ে দিলেই কি ঢাকার রাস্তা স্বাভাবিক হয়ে যাবে?
বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি অনেক বেশি বিস্তৃত। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল করে দোকান, ভাসমান ব্যবসা এবং অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে হাঁটছেন। একই সঙ্গে রাস্তার বড় অংশ দখল করে অবৈধ পার্কিং করার ফলে যান চলাচলের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ করার কিছুদিনের মধ্যেই তা পুনরায় দখল হয়ে যায়।
সম্প্রতি পুরান ঢাকায় পরিচালিত এক অভিযানে অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ১৫৮টি মামলা এবং দুই সপ্তাহে ১৪৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের তথ্য পাওয়া গেছে। যা প্রমাণ করে—যানজট সৃষ্টিতে অটোরিকশার পাশাপাশি অবৈধ পার্কিং ও সড়ক দখলের ভূমিকা প্রশাসনের অজানা নয়।
এ কারণে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক যানবাহন বন্ধ করে দিলে স্বল্প দূরত্বের যাত্রী পরিবহন, অলিগলি থেকে প্রধান সড়কে যাতায়াত এবং নিম্নআয়ের বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অতীতেও ঢাকায় রিকশা নিষেধাজ্ঞার একাধিক সিদ্ধান্ত বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বারবার পরিবর্তিত হতে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার যানজট নিরসনে প্রয়োজন একটি সমন্বিত নগর পরিবহন পরিকল্পনা। যার মধ্যে থাকবে— ১. অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ।
২. চালকদের নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আনা।
৩. প্রধান সড়ক ও অলিগলির জন্য পৃথক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।
৪. ফুটপাত পুরোপুরি দখলমুক্ত করে পথচারীবান্ধব করা।
৫. নির্ধারিত পার্কিং স্পেস তৈরি ও অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
৬. পর্যাপ্ত ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
নগরবিদদের স্পষ্ট মত—শুধু নিম্নআয়ের মানুষের বাহন বন্ধ করে শহরের যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, আবার অটোরিকশার অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই মূল লড়াইটা অটোরিকশা উচ্ছেদ বনাম চলাচলের নয়; বরং ঢাকাকে কীভাবে একটি পরিকল্পিত, সুনিয়ন্ত্রিত ও পথচারীবান্ধব নগরে রূপান্তর করা যায়—সেটিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, রাস্তা-ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা এবং অবৈধ পার্কিং বন্ধের পর ধাপে ধাপে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা হলেই এর বাস্তব সুফল পাওয়া যাবে। ঢাকাবাসী শুধু লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান দেখতে চায় না—তারা চায় সচল রাস্তা, নিশ্চিন্তে হাঁটার মতো ফুটপাত এবং একটি জবাবদিহিমূলক নগর ব্যবস্থাপনা।