কালান্তর নিউজ ডেস্ক
২৭ মে ২০২৬, ৭:১৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টেই কাটল তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১০০ দিন

ভঙ্গুর অর্থনীতি, নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং গভীর সামাজিক বিভাজনের মতো ত্রিমুখী সংকট মাথায় নিয়ে গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এক বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হলো। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে নির্বাচনী ইশতেহার ও ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের কিছু জনবান্ধব উদ্যোগ যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক সংস্কার ও প্রশাসনিক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে বর্তমান প্রশাসনকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাত্র ১০০ দিনের মাথায় একটি পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের সামগ্রিক সফলতা-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা সম্ভব না হলেও, তাদের ভবিষ্যৎ নীতি ও কর্মপন্থার একটি স্পষ্ট আভাস এই সময়ে পাওয়া গেছে।

অর্থনৈতিক সংস্কার: এখনো কাটেনি উদ্বেগ

নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সামাল দেওয়া। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই সময়কালকে মূলত ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ বা সংকট ব্যবস্থাপনার সময় হিসেবেই দেখছেন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)–এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক ঋণের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে সরকার। তাছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহের গতিও ইতিবাচক। তবে আগের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো এখনো অব্যাহত আছে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হওয়ায় সরকারের উন্নয়ন ও ভর্তুকির সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আসন্ন বাজেটেই বোঝা যাবে সরকার আসলে অর্থনীতি নিয়ে কী ভাবছে। ব্যাংকিং অর্ডিন্যান্স এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।”

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: মব ভায়োলেন্স ও পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে বলে সাধারণ মানুষ আশা করলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ধর্ষণ, ছিনতাই ও মাদকের মতো অপরাধ এখনো উদ্বেগের কারণ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ পুলিশের পেশাদারিত্ব ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “সম্প্রতি কালশীতে পুলিশের দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি খুবই দৃষ্টিকটু ছিল। পুলিশ এখনো পুরোপুরি সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।” তবে মাঠ পর্যায় থেকে সেনাবাহিনীকে ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া এবং মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানকে পরিস্থিতির উন্নতির নির্দেশক হিসেবে দেখছেন অনেকে। র‍্যাব বিলুপ্ত না করে এটিকে একটি আইনি কাঠামোর আওতায় এনে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার।

সংসদে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও হামের প্রাদুর্ভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, “সরকার এখন পর্যন্ত বিরোধী দলগুলোর সাথে সংঘাত এড়িয়ে সংসদে আলোচনার পরিবেশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার লক্ষণ। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে-বাইরে বিরোধীদের সমালোচনা সরকারকে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।”

এদিকে স্বাস্থ্য খাতে নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। এই রোগে ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করে দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার।

যা বলছে সরকার: ৬০টি সিদ্ধান্তের ৬২% বাস্তবায়িত

সরকারের ১০০ দিনের কর্মসূচি নিয়ে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান ও অর্জনের খতিয়ান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

গত ১০০ দিনে মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে মোট ৬০টি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি (প্রায় ৬২ শতাংশ) ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।

প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং এস আলম গ্রুপের প্রায় ৪,২৬৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করার মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।

কৃষি খাতে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়েছে এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।

মেহেরপুরের একটি ধর্ষণ মামলায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার নজির স্থাপন করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ: খুলনায় জাতীয় ছাত্রশক্তির সংগঠক ফাহিম মিয়া স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত

১

Nouveau casino en ligne : les limites et les règles de jeu responsable

২

Spotify Review 2026

৩

গঙ্গাচড়ায় ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ, কঠোর হুঁশিয়ারি

৪

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শিবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ

৫

রাজশাহীতে চোরাই ল্যাপটপ ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

৬

শতবর্ষী বিদ্যালয়ের মাঠে ড্রেন নির্মাণ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

৭

ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল

৮

মাদ্রাসা শিক্ষককে পেটানোই সমাধান নয়, অপরাধীর পরিচয় ধর্ম নয়, অপরাধীই: সাম্প্রদায়িক ট্যাগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ

৯

রাজশাহীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে, পুনর্বাসিত হবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

১০

নোবিপ্রবিতে নবীনবরণ ৭ নভেম্বর, থাকছেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা

১১

তাড়াইলে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট, ২ হাজার ৬০০ টাকাতেও মিলছে না সিলিন্ডার

১২

বাঘারপাড়ার জহুরপুরে ২০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, প্রকৃতির অনন্য তোরণ

১৩

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ পালিত: আলোচনা সভা ও মানববন্ধন

১৪

ডিপিসি সম্পন্ন, তবু পদোন্নতির জিও নেই: অপেক্ষায় ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার

১৫

নবীনগরে গাছের চারা লাগানো নিয়ে বিরোধ, বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৬

সুন্দরবনে জাহাজের ধাক্কায় ডুবল কয়লাবাহী কার্গো, তলিয়ে গেল ১,২৫০ টন কয়লা

১৭

মিরসরাইয়ের নতুন ইউএনও মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জনসেবায় বাড়ছে প্রত্যাশা

১৮

নির্বাচন কমিশনকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় জোটের

১৯

টঙ্গীর শিশু নিপীড়ন বিতর্কে নতুন মোড়, দেশ ছাড়ার দাবি শিশুটির বাবার

২০