খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অস্ত্রের মহড়া, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ—কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, এই অপরাধের শেষ কোথায়?
অপরাধী চক্রগুলো কীভাবে শক্তিশালী হচ্ছে, তাদের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস কোথায়, আর নেপথ্যে কোনো প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
প্রকাশিত পুলিশি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা মহানগরীর আট থানায় ৯৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, স্বজন হারানোর বেদনা এবং নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের গভীর উদ্বেগ।
অপরাধীরা শক্তিশালী হচ্ছে কীভাবে?
কোনো অপরাধী চক্র রাতারাতি এতটা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে না। তাদের পেছনে অর্থের জোগান, যোগাযোগ, অস্ত্রের উৎস, অপরাধের নেটওয়ার্ক এবং কখনো কখনো প্রভাব খাটানোর অভিযোগও সামনে আসে। খুলনায় এমন কোনো যোগসূত্র থাকলে তা উদ্ঘাটন করা পুলিশের দায়িত্ব। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, আইনের প্রয়োগে বৈষম্য চলতে পারে না।
প্রশ্ন হলো, অপরাধী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেই কি দায়িত্ব শেষ? তাদের অর্থদাতা কারা, অবৈধ অস্ত্র কোথা থেকে আসে, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত কেন থামছে না—এসব প্রশ্নের উত্তর কোথায়? শুধু মাঠপর্যায়ের কয়েকজনকে আটক করে নেপথ্যের নেটওয়ার্ক অক্ষত রেখে দিলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন।
গ্রেপ্তার হয়, জামিন পায়—তারপর কী?
গুরুতর অপরাধের মামলাগুলোর তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে জনমনে হতাশা তৈরি হয়। জামিনের অপব্যবহার বা পুনরায় অপরাধে জড়ানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখানে প্রশ্ন আদালতকে আক্রমণ করা নয়; প্রশ্ন হলো, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া কতটা কার্যকর, অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পুলিশের পরিকল্পনা কী এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না।
চাঁদাবাজির অভিযোগে অতিষ্ঠ মানুষ, প্রশাসনের ভূমিকা কী?
বাস টার্মিনাল, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ফুটপাত ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে সেগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদে প্রশাসন তৎপর হতে পারে, কিন্তু সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজির অভিযোগে একই দৃশ্যমান তৎপরতা কোথায়—এ প্রশ্নের জবাব জনগণ চাইতেই পারে।
আইন সবার জন্য সমান হলে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ধারী—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না।
অভিযোগের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত প্রশাসনের অগ্রাধিকার।
অস্ত্র ও মাদক কারবারের শিকড় উপড়ে ফেলা হচ্ছে না কেন?
অবৈধ অস্ত্র ও মাদক শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিষয় নয়; এগুলো সংঘবদ্ধ সহিংসতা ও আধিপত্য বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শুধু অভিযান চালিয়ে কিছু অস্ত্র বা মাদক উদ্ধার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এসবের সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের উৎস এবং অপরাধী নেটওয়ার্কের যোগসূত্র শনাক্ত করা প্রয়োজন।
খুলনায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কতটি অভিযান হয়েছে, কতটি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, কতটি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।
জনগণ আশ্বাস নয়, ফলাফল দেখতে চায়।
প্রশাসনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন
খুলনা মহানগরীতে হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনা তদন্তের অগ্রগতি কী? সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান চলছে কি? চাঁদাবাজির অভিযোগে কারা শনাক্ত হয়েছে? অবৈধ অস্ত্র ও মাদক কারবারের অর্থদাতাদের খুঁজে বের করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? অপরাধের সঙ্গে প্রভাবশালী কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও কি একইভাবে আইন প্রয়োগ করা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উচিত যাচাইযোগ্য তথ্য দিয়ে জনগণকে অবহিত করা।খুলনা কারও ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়।
এই শহর সাধারণ মানুষের, শ্রমজীবী মানুষের, শিক্ষার্থীদের, ব্যবসায়ীদের এবং আগামী প্রজন্মের।
এখানে কেউ অস্ত্রের জোরে, টাকার জোরে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে মানুষের জীবনকে জিম্মি করতে পারে না। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ থাকলে তারও তদন্ত হোক। প্রশাসনের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশের নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
শেষ কথা—খুলনাবাসী নিরাপত্তা চায়, আশ্বাসের বন্যা নয়। তারা অপরাধের নেপথ্যের যোগসূত্র জানতে চায়, বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি দেখতে চায় এবং অপরাধীর পরিচয় নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ চায়।
প্রশাসনকে এখনই দৃশ্যমান, পরিমাপযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ দেখাতে হবে। কারণ অপরাধের কাছে নীরবতা কোনো সমাধান নয়; আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কালান্তর নিউজের প্রশ্ন: খুলনার মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাঁরা কি সেই দায়িত্বের পূর্ণ জবাব দিতে প্রস্তুত?