এক বছরে মহাসড়কে ৮২ দুর্ঘটনায় ৪২ জনের মৃত্যু, অর্থনৈতিক অঞ্চল সড়কেও প্রাণহানি; সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে মাদকদ্রব্যের বিস্তার, ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসংলগ্ন সড়কে যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের দাবি উঠেছে।
মাদক তরুণ প্রজন্ম ও পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে, মহাসড়ক ও শিল্পাঞ্চলের সড়কে ট্রাফিক আইন অমান্য, ঝুঁকিপূর্ণভাবে যানবাহন চালানো এবং দ্রুতগতির ভারী যানবাহনের সঙ্গে ছোট যানবাহনের সংঘর্ষ প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়।
মিরসরাইয়ের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতা উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই অংশে ৮২টি দুর্ঘটনায় ৪২ জন নিহত হন। একই সময়ে দুর্ঘটনায় আহত হন অন্তত ১৩৪ জন।
প্রতিবেদনটিতে হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, অতিরিক্ত গতি, চালকের অসতর্কতা, মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চলাচল, রাস্তার ত্রুটি এবং মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ভারী যানবাহন দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে দুর্ঘটনার সব কারণ এক নয়। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে যানবাহনের অবস্থা, চালকের আচরণ, সড়কের পরিস্থিতি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মিরসরাইয়ে মাদকদ্রব্যের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে। মাদক ব্যবসার উৎস, সরবরাহের পথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।
এদিকে, মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু সদস্যের কথিত গোপন সখ্যতার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এ অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু পদক্ষেপও প্রকাশ্যে এসেছে। আরটিভি অনলাইনে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা এলাকায় ২০ আগস্ট থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৯ দিনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৮৩টি মামলা করা হয় এবং ৮৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তবে অভিযান চলার পাশাপাশি মাদকের সরবরাহ স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে কি না, পুনরায় একই অপরাধে জড়িত হওয়ার প্রবণতা কতটা কমছে এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত, মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত, অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের মিরসরাই অংশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের চলাচল দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সমস্যা। মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে এসব ছোট যানবাহনের চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি বড়তাকিয়া বাজার এলাকায় জাহেদিয়া মাদরাসার সামনে একটি দ্রুতগতির ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনায় মাদরাসাছাত্রী খাদিজা মাশমুমসহ দুজন নিহত এবং তিনজন আহত হন। দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের একটি পুকুরে পড়ে যায়।
এই ঘটনা মহাসড়কের পাশে যাত্রী ওঠানামা, নিরাপদ স্থানে যানবাহন থামানো এবং দ্রুতগতির যানবাহনের নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব সামনে এনেছে। তবে একটি দুর্ঘটনার ভিত্তিতে সব ঘটনার কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
মহাসড়কে যানবাহন চলাচলসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও বিধিনিষেধ যথাযথভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় যাত্রীদের জন্য নিরাপদ বিকল্প পরিবহন, নির্ধারিত স্টপেজ এবং বাজারকেন্দ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।
হাইওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং চালকদের সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হলে ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসংলগ্ন সড়কে শিল্পকারখানার কর্মী পরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, কনটেইনারবাহী যানবাহন, মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহন চলাচল করে। ফলে এসব সড়কে যানবাহনের গতি, চলাচলের শৃঙ্খলা এবং নিরাপদ যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের ৫ জুলাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সড়কের আবুতোরাব বাজারের মাথায় উল্টো দিক থেকে আসা একটি অটোরিকশার সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে মিরসরাইয়ের উপজেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন নিহত হন বলে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রবেশমুখের সিপি মোড়ে কনটেইনারবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দুর্ঘটনায় ঠিকাদার মোহাম্মদ হোসেন নিহত এবং অটোরিকশাচালক আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
এসব পৃথক দুর্ঘটনা অর্থনৈতিক অঞ্চলসংলগ্ন সড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে প্রতিটি ঘটনার কারণ আলাদাভাবে তদন্ত করে নির্ধারণ করা উচিত।
এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রবেশপথে গতিসীমার নির্দেশক, পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিড ক্যামেরা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবহন ব্যবস্থাপনা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং কর্মী পরিবহনের নিরাপত্তাবিধি কার্যকর করা জরুরি।
মিরসরাইয়ের তিনটি সমস্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি পদক্ষেপ বিবেচনার দাবি জানানো হচ্ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে: মাদক ব্যবসার উৎস শনাক্ত, নিয়মিত অভিযান, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
জাতীয় মহাসড়কে: আইন অনুযায়ী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, অননুমোদিত থ্রি-হুইলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, নিরাপদ স্টপেজ নির্ধারণ এবং বাজার এলাকায় নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি জোরদার করা।
অর্থনৈতিক অঞ্চল সড়কে: গতিসীমা কার্যকর করা, ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানো, ভারী যানবাহনের চলাচল তদারকি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন, থানা-পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মাদক, অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচল এবং বেপরোয়া গতির মতো সমস্যার সমাধানে শুধু সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন।
মিরসরাইয়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, জাতীয় মহাসড়কে শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল সড়কে নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশিত।
জনস্বার্থে প্রশ্ন উঠছে: মিরসরাইয়ের এসব সমস্যা স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও সমন্বিত পদক্ষেপ কবে আরও জোরদার হবে?
কালান্তর নিউজ জননিরাপত্তা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সংবাদ প্রকাশে অঙ্গীকারবদ্ধ।