রবি মল্লিক, খুলনা | কালান্তর নিউজ
খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গোলপাতার ঘর, কাদামাখা নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা, আর জোয়ারের অপেক্ষায় থাকা জেলেদের ব্যস্ততা। বাইরে থেকে দেখলে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা কালাবগি-নলিয়ানকে মনে হবে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এক শান্ত জনপদ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জীবিকার সংকট আর প্রতিনিয়ত টিকে থাকার লড়াই।
খুলনা শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালি ইউনিয়নের এই জনপদ। শিবসা নদীর তীরঘেঁষা এলাকাটির একদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে নদী ও জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষ। নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশন সুন্দরবনে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবেও পরিচিত।
কালাবগি-নলিয়ানের মানুষের জীবন নদীকে ঘিরেই আবর্তিত। নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে চলে সংসার। অথচ সেই নদীর ভাঙনেই হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও মানুষের দীর্ঘদিনের স্মৃতি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শিবসা নদীর ভাঙনে দাকোপের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি বিলীন হয়েছে। সুতারখালি, কামারখোলা ও পানখালি এলাকায় বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এসব ক্ষয়ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কালাবগির বাসিন্দা আসাদুল ফকিরও নদীভাঙনের শিকার। একসময় নিজের বাড়িতে গরু পালন করতেন, জমিতে ধান চাষ করতেন। এখন জীবিকার তাগিদে খুলনা শহরে রিকশা চালান।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “চোখের সামনে তিলে তিলে নিজের বসতবাড়ি হারিয়ে যেতে দেখার মতো যন্ত্রণা আর নেই। একসময় বাড়িতে গরু পালতাম, বিলে ধান রোপণ করতাম। এখন শহরে সবকিছুতে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।”
তাঁর মতো অনেক মানুষের কাছে নদীভাঙন শুধু জমি হারানোর ঘটনা নয়, বরং পরিচিত জীবন, পেশা ও শিকড় হারানোরও নাম।
কালাবগি-নলিয়ানের অনেক বাড়ি তৈরি করা হয়েছে উঁচু খুঁটির ওপর। এর পেছনে রয়েছে জোয়ারের পানির ঝুঁকি। পানি বাড়লে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়, বাড়িঘর ও চলাচলের পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ ও নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। কোথাও কোথাও জিওব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নিরাপদ বসতি, টেকসই বেড়িবাঁধ এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ এখন এই জনপদের মানুষের অন্যতম দাবি।
জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিন নদী ও সুন্দরবনসংলগ্ন জলপথে যেতে হয় জেলেদের। সেখানে বাঘ ও কুমিরের ঝুঁকি তো রয়েছেই, পাশাপাশি রয়েছে জলদস্যুদের ভয়।
স্থানীয়ভাবে প্রচারিত খবর অনুযায়ী, নলিয়ান কোস্টগার্ড আউটপোস্টের সদস্যরা শিবসার আরবানিয়া খালে অভিযান চালিয়ে সম্রাট বাহিনীর কবল থেকে চার জেলেকে উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।
এ ধরনের ঘটনা জেলেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। ঘটনার তারিখ, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বক্তব্য যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
জেলেদের কাছে নদীতে যাওয়া মানেই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া। প্রতিদিন ভোরে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা। মাছ ও কাঁকড়া ধরে ফিরতে পারলে চলে সংসার, আর দুর্ঘটনা কিংবা অপহরণের শিকার হলে পুরো পরিবার পড়ে যায় বিপাকে।
নদীভাঙনের পাশাপাশি লবণাক্ততাও এ অঞ্চলের মানুষের জীবনে বড় সংকট। মাটির লবণাক্ততা কৃষিকাজকে কঠিন করে তুলছে। নিরাপদ পানীয় জলের সংকটও স্থানীয়দের দুর্ভোগ বাড়ায়।
অনেক পরিবারকে দূরবর্তী উৎস থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। কৃষিকাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় মাছ ও কাঁকড়া আহরণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। ফলে নদীতে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে চলাচল বন্ধ হলে আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
সব সংকটের পরও কালাবগি-নলিয়ানের মানুষ জীবন থামিয়ে রাখেননি। প্রতিদিন নৌকা নিয়ে নদীতে যান, ঘরবাড়ি মেরামত করেন, সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই তাঁরা টিকিয়ে রেখেছেন নিজেদের জনপদ।
সুন্দরবনের পাশে বসবাসকারী এই মানুষদের জীবন শুধু একটি প্রত্যন্ত গ্রামের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জীবিকার সংকটের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
তাই কালাবগি-নলিয়ানের মানুষের জন্য প্রয়োজন টেকসই বেড়িবাঁধ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সুন্দরবনে যাতায়াতকারী জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নদী ও সুন্দরবনকে ঘিরে যাঁদের জীবন, তাঁদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা শুধু স্থানীয় উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, বরং উপকূলের মানুষ ও প্রকৃতি রক্ষারও প্রশ্ন।
কালাবগি-নলিয়ান আজও টিকে আছে। কিন্তু এই জনপদের মানুষ কত দিন এভাবে টিকে থাকতে পারবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কার্যকর উদ্যোগ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের ওপর।