কালান্তর নিউজ ডেস্ক
১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কালাবগি-নলিয়ান: সুন্দরবনের কোলে নদীভাঙনে বিপর্যস্ত জনপদ

সুন্দরবনের কোলঘেঁষে কালাবগি-নলিয়ান, নদীভাঙন আর অনিশ্চয়তায় বেঁচে থাকা মানুষের গল্প

রবি মল্লিক, খুলনা | কালান্তর নিউজ

খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গোলপাতার ঘর, কাদামাখা নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা, আর জোয়ারের অপেক্ষায় থাকা জেলেদের ব্যস্ততা। বাইরে থেকে দেখলে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা কালাবগি-নলিয়ানকে মনে হবে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এক শান্ত জনপদ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জীবিকার সংকট আর প্রতিনিয়ত টিকে থাকার লড়াই।

খুলনা শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালি ইউনিয়নের এই জনপদ। শিবসা নদীর তীরঘেঁষা এলাকাটির একদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে নদী ও জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষ। নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশন সুন্দরবনে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবেও পরিচিত।

নদীই জীবিকা, নদীই সর্বনাশ

কালাবগি-নলিয়ানের মানুষের জীবন নদীকে ঘিরেই আবর্তিত। নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে চলে সংসার। অথচ সেই নদীর ভাঙনেই হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও মানুষের দীর্ঘদিনের স্মৃতি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শিবসা নদীর ভাঙনে দাকোপের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি বিলীন হয়েছে। সুতারখালি, কামারখোলা ও পানখালি এলাকায় বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এসব ক্ষয়ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কালাবগির বাসিন্দা আসাদুল ফকিরও নদীভাঙনের শিকার। একসময় নিজের বাড়িতে গরু পালন করতেন, জমিতে ধান চাষ করতেন। এখন জীবিকার তাগিদে খুলনা শহরে রিকশা চালান।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “চোখের সামনে তিলে তিলে নিজের বসতবাড়ি হারিয়ে যেতে দেখার মতো যন্ত্রণা আর নেই। একসময় বাড়িতে গরু পালতাম, বিলে ধান রোপণ করতাম। এখন শহরে সবকিছুতে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।”

তাঁর মতো অনেক মানুষের কাছে নদীভাঙন শুধু জমি হারানোর ঘটনা নয়, বরং পরিচিত জীবন, পেশা ও শিকড় হারানোরও নাম।

জোয়ারের পানির ভয়ে উঁচুতে ঘর

কালাবগি-নলিয়ানের অনেক বাড়ি তৈরি করা হয়েছে উঁচু খুঁটির ওপর। এর পেছনে রয়েছে জোয়ারের পানির ঝুঁকি। পানি বাড়লে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়, বাড়িঘর ও চলাচলের পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ ও নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। কোথাও কোথাও জিওব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নিরাপদ বসতি, টেকসই বেড়িবাঁধ এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ এখন এই জনপদের মানুষের অন্যতম দাবি।

সুন্দরবনের জীবনে বাঘ-কুমিরের ঝুঁকি, সঙ্গে জলদস্যুর আতঙ্ক

জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিন নদী ও সুন্দরবনসংলগ্ন জলপথে যেতে হয় জেলেদের। সেখানে বাঘ ও কুমিরের ঝুঁকি তো রয়েছেই, পাশাপাশি রয়েছে জলদস্যুদের ভয়।

স্থানীয়ভাবে প্রচারিত খবর অনুযায়ী, নলিয়ান কোস্টগার্ড আউটপোস্টের সদস্যরা শিবসার আরবানিয়া খালে অভিযান চালিয়ে সম্রাট বাহিনীর কবল থেকে চার জেলেকে উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।

এ ধরনের ঘটনা জেলেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। ঘটনার তারিখ, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বক্তব্য যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।

জেলেদের কাছে নদীতে যাওয়া মানেই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া। প্রতিদিন ভোরে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা। মাছ ও কাঁকড়া ধরে ফিরতে পারলে চলে সংসার, আর দুর্ঘটনা কিংবা অপহরণের শিকার হলে পুরো পরিবার পড়ে যায় বিপাকে।

লবণাক্ততায় সংকুচিত জীবিকা

নদীভাঙনের পাশাপাশি লবণাক্ততাও এ অঞ্চলের মানুষের জীবনে বড় সংকট। মাটির লবণাক্ততা কৃষিকাজকে কঠিন করে তুলছে। নিরাপদ পানীয় জলের সংকটও স্থানীয়দের দুর্ভোগ বাড়ায়।

অনেক পরিবারকে দূরবর্তী উৎস থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। কৃষিকাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় মাছ ও কাঁকড়া আহরণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। ফলে নদীতে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে চলাচল বন্ধ হলে আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

সুন্দরবনকে আগলে রেখেও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সব সংকটের পরও কালাবগি-নলিয়ানের মানুষ জীবন থামিয়ে রাখেননি। প্রতিদিন নৌকা নিয়ে নদীতে যান, ঘরবাড়ি মেরামত করেন, সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই তাঁরা টিকিয়ে রেখেছেন নিজেদের জনপদ।

সুন্দরবনের পাশে বসবাসকারী এই মানুষদের জীবন শুধু একটি প্রত্যন্ত গ্রামের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জীবিকার সংকটের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।

তাই কালাবগি-নলিয়ানের মানুষের জন্য প্রয়োজন টেকসই বেড়িবাঁধ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সুন্দরবনে যাতায়াতকারী জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

নদী ও সুন্দরবনকে ঘিরে যাঁদের জীবন, তাঁদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা শুধু স্থানীয় উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, বরং উপকূলের মানুষ ও প্রকৃতি রক্ষারও প্রশ্ন।

কালাবগি-নলিয়ান আজও টিকে আছে। কিন্তু এই জনপদের মানুষ কত দিন এভাবে টিকে থাকতে পারবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কার্যকর উদ্যোগ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের ওপর।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ: খুলনায় জাতীয় ছাত্রশক্তির সংগঠক ফাহিম মিয়া স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত

১

Nouveau casino en ligne : les limites et les règles de jeu responsable

২

Spotify Review 2026

৩

গঙ্গাচড়ায় ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ, কঠোর হুঁশিয়ারি

৪

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শিবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ

৫

রাজশাহীতে চোরাই ল্যাপটপ ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

৬

শতবর্ষী বিদ্যালয়ের মাঠে ড্রেন নির্মাণ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

৭

ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল

৮

মাদ্রাসা শিক্ষককে পেটানোই সমাধান নয়, অপরাধীর পরিচয় ধর্ম নয়, অপরাধীই: সাম্প্রদায়িক ট্যাগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ

৯

রাজশাহীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে, পুনর্বাসিত হবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

১০

নোবিপ্রবিতে নবীনবরণ ৭ নভেম্বর, থাকছেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা

১১

তাড়াইলে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট, ২ হাজার ৬০০ টাকাতেও মিলছে না সিলিন্ডার

১২

বাঘারপাড়ার জহুরপুরে ২০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, প্রকৃতির অনন্য তোরণ

১৩

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ পালিত: আলোচনা সভা ও মানববন্ধন

১৪

ডিপিসি সম্পন্ন, তবু পদোন্নতির জিও নেই: অপেক্ষায় ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার

১৫

নবীনগরে গাছের চারা লাগানো নিয়ে বিরোধ, বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৬

সুন্দরবনে জাহাজের ধাক্কায় ডুবল কয়লাবাহী কার্গো, তলিয়ে গেল ১,২৫০ টন কয়লা

১৭

মিরসরাইয়ের নতুন ইউএনও মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জনসেবায় বাড়ছে প্রত্যাশা

১৮

নির্বাচন কমিশনকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় জোটের

১৯

টঙ্গীর শিশু নিপীড়ন বিতর্কে নতুন মোড়, দেশ ছাড়ার দাবি শিশুটির বাবার

২০