রাজনীতি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয় তৈরি কিংবা আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রতিষ্ঠিত করার হাতিয়ার নয়। একটি রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে আদর্শ, ত্যাগ, শ্রম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে।
কিন্তু যখন যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয়, ত্যাগের চেয়ে তদবির এবং সাংগঠনিক অবদানের চেয়ে ঘনিষ্ঠতা বেশি গুরুত্ব পায়, তখন প্রশ্ন ওঠে দলীয় নেতৃত্বের নৈতিকতা ও সাংগঠনিক ন্যায়বিচার নিয়ে।
দল কি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি, নাকি হাজারো নেতা-কর্মীর ত্যাগে গড়ে ওঠা একটি সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দিতে হবে নিজেদের কাজের মাধ্যমে।
রাজনীতির কঠিন সময়ে যাঁরা দলের পাশে ছিলেন, প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন, নানা ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা নেতৃত্বের দায়িত্ব। অথচ যোগ্য ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের পাশ কাটিয়ে শুধু ঘনিষ্ঠজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
একজনের স্বজনপ্রীতি হয়তো কয়েকজনকে সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো সংগঠনের ওপর। কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয় বঞ্চনাবোধ, কমে যায় কাজের আগ্রহ এবং দুর্বল হয়ে পড়ে সাংগঠনিক ঐক্য।
যে কর্মী বছরের পর বছর দলের জন্য কাজ করেন, তিনি যদি দেখেন তাঁর ত্যাগের চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এই সংগঠনে যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মূল্য কোথায়?
রাজনৈতিক পদ-পদবি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি দলের প্রতি দায়িত্ব পালনের একটি মাধ্যম। নেতৃত্বের আসনে বসার অর্থ শুধু ক্ষমতা ভোগ করা নয়, বরং নেতা-কর্মীদের আস্থা অর্জন, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করা।
তাই নেতৃত্ব নির্বাচনে সততা, যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ত্যাগ এবং জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রভাব কিংবা তদবিরের ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা হলে যোগ্য নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়।
একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কে কার ঘনিষ্ঠ, সেটি মুখ্য বিষয় হতে পারে না। বরং কে কতটা দায়িত্বশীল, কে সংগঠনের জন্য কতটা কাজ করেছেন এবং কে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি।
স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে শুধু বক্তব্য দিলেই চলবে না, এর প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। দলের প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টনের জন্য সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড থাকা জরুরি।
জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের সাংগঠনিক অবদান মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পদপ্রত্যাশীদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একই সঙ্গে পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীদের অভিযোগ শোনা এবং পক্ষপাতের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার সুযোগ রাখতে হবে।
নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমবে। এতে যোগ্য নেতা-কর্মীরা উৎসাহিত হবেন এবং সংগঠনের প্রতি তাঁদের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি শুধু তার শীর্ষ নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়। এর শক্তি ছড়িয়ে থাকে তৃণমূলের অসংখ্য নেতা-কর্মীর মধ্যে, যাঁরা নিজেদের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য দিয়ে সংগঠনকে এগিয়ে নেন।
তাঁদের অবদানকে শুধু সভা-সমাবেশে প্রশংসা কিংবা আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেতৃত্বের যোগ্য হয়ে যান না। নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মূল্যায়ন হতে হবে ন্যায়সংগত, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, যোগ্যতা ও বাস্তব অবদানই প্রাধান্য পাবে।
ব্যক্তিগত বলয় তৈরি করে সাময়িকভাবে ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি সংগঠনকে শক্তিশালী করা যায় না। সংগঠনের ভিত মজবুত হয় কর্মীদের ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থার মাধ্যমে।
যেখানে যোগ্যতার মূল্যায়ন হয়, সেখানে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়। যেখানে ত্যাগের স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেখানে কর্মীরা আরও বেশি দায়িত্বশীল হন। আর যেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়, সেখানে সংগঠনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস বাড়ে।
অন্যদিকে, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতের চর্চা চলতে থাকলে অভিজ্ঞ ও যোগ্য কর্মীরা একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারেন। এর ফলে সংগঠন হারাতে পারে তার দক্ষ জনবল, সাংগঠনিক শক্তি এবং জনসম্পৃক্ততা।
রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নির্ধারিত হোক যোগ্যতা, সততা, সাংগঠনিক অবদান ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে। পদ-পদবি বণ্টনে স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিগত প্রভাবের পরিবর্তে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হোক। ত্যাগী নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হোক বাস্তব কাজের মাধ্যমে।
মনে রাখতে হবে, একটি রাজনৈতিক দল কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা নির্দিষ্ট বলয়ের একক সম্পত্তি নয়। এটি অসংখ্য মানুষের ত্যাগ, শ্রম, স্বপ্ন ও বিশ্বাসের সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান। তাই দলীয় নেতৃত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্তে ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সাংগঠনিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
স্বজনপ্রীতি হয়তো কাউকে পদে বসাতে পারে, কিন্তু যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। ব্যক্তিগত বলয় নয়, যোগ্য নেতৃত্ব; তদবির নয়, সাংগঠনিক অবদান; পক্ষপাত নয়, ন্যায়বিচারই হোক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।
রাজনীতিকে মানুষের আস্থা ও কল্যাণের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এখনই স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ, দল শক্তিশালী হলে নেতা-কর্মীরা শক্তিশালী হন, আর নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হলেই সংগঠনের ভবিষ্যৎ হয় আরও সুদৃঢ়।