খুলনা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে খুলনা-যশোর মহাসড়কের পাশে ফুলবাড়িগেটের তেলিগাতীতে সবুজে ঘেরা ১১৭.৪৮ একরের ক্যাম্পাস। এটি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটি শুধু উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন পূরণের অন্যতম ঠিকানা।
১৯৬৭ সালে খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ দেশের অন্যতম পরিচিত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে এর নাম, প্রশাসনিক কাঠামো ও শিক্ষার পরিধি। তবে প্রকৌশল শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যটি রয়ে গেছে অটুট।
খুলনার তেলিগাতী এলাকায় অবস্থিত কুয়েটের ভৌগোলিক অবস্থান শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। খুলনা-যশোর মহাসড়কের পাশে হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে রয়েছে খুলনার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ, বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা এবং গবেষণার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রায় ১১৭ একরের ক্যাম্পাসে রয়েছে একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসন, গবেষণাগার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা। সবুজে ঘেরা পরিবেশে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন।
কুয়েটের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এর বিকাশকে প্রধানত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।
প্রথম অধ্যায়: খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (১৯৬৭-১৯৮৬)
১৯৬৭ সালে খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হিসেবে পরিচালিত হতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় এর উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। স্বাধীনতার পর আবারও কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
১৯৭৪ সালের ৩ জুন থেকে কলেজটির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। তবে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়, শিক্ষকসংকটসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে যেতে হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: বিআইটি খুলনা (১৯৮৬-২০০৩)
১৯৮৬ সালের ১ জুলাই খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি), খুলনায় রূপান্তরিত হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করে।
এই পর্যায়ে প্রকৌশল শিক্ষার বিস্তার এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তৃতীয় অধ্যায়: কুয়েটের যাত্রা (২০০৩ থেকে বর্তমান)
২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিআইটি খুলনা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) নামে যাত্রা শুরু করে।
এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষার একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে কুয়েট।
কুয়েটে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, স্থাপত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরিতে কুয়েটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি খাতে অবদান রাখছেন। এ কারণে কুয়েট শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
কুয়েটের মূলমন্ত্র ‘প্রভু! আমায় জ্ঞান দাও’। জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় নিয়েই এগিয়ে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৬৭ সালে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে ২০০৩ সালে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়া কুয়েটের ইতিহাস বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার বিকাশেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আপনি কি কুয়েটের সাবেক বা বর্তমান শিক্ষার্থী? ক্যাম্পাসের স্মরণীয় কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে মন্তব্যে জানাতে পারেন