বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও মৎস্য আহরণ প্রক্রিয়ায় চরম অব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, বনদস্যু ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সমন্বিত অনিয়ম ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে সুন্দরবনের সরকারি রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়াটি এখন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে মৎস্য ও কাঁকড়াসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ আহরণ কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলেও বাস্তব সরেজমিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সবকিছুই যেন স্বাভাবিক নিয়মে চলছে, শুধু রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল জানায়, বন বিভাগের অসাধু চক্রকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে জেলেরা বনে ঢুকছে এবং মাছ-কাঁকড়া ধরে লোকালয়ে নিয়ে আসছে।
বৈধ পাসের আড়ালে কারচুপি: অনুসন্ধানে জানা যায়, বনের সম্পদ আহরণের অনুমতিপত্র বা ‘পাস’ ইস্যু প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের কারচুপি চলছে। নির্দিষ্ট মেয়াদে গোলপাতা সংগ্রহ বা মাছ ধরার জন্য পাস দেওয়া হলেও, বাস্তবে একটি পাসের আড়ালে অনুমোদিত সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে। এই অনিয়ম সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার পরিবর্তে বিপুল অঙ্কের অর্থ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী মহলের পকেটে।
ত্রিমুখী চাঁদাবাজিতে পিষ্ট বনজীবীরা: ভুক্তভোগী স্থানীয় জেলে ও বাওয়ালিদের অভিযোগ, বন বিভাগ থেকে বৈধ পাস পাওয়ার পরও তাদের নানামুখী হয়রানির শিকার হতে হয়। বনের ভেতর সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে তাদের বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বনদস্যু ও স্থানীয় প্রভাবশালী চাঁদাবাজদের নির্দিষ্ট হারে মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। এই ত্রিমুখী অবৈধ লেনদেনের কারণে প্রকৃত বনজীবীরা তাদের আয়ের বিশাল অংশ হারিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছেন।
দুর্বল মনিটরিং ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
সুন্দরবনের বিশাল আয়তন জুড়ে কার্যকর তদারকি ও আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থার ভয়াবহ অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকায় এবং মাঠ পর্যায়ে বন কর্মকর্তাদের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় অবৈধ সম্পদ পাচার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও রাজস্ব রক্ষা করতে হলে পারমিট ইস্যু প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করা এবং ‘ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম’ বা স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে বনজীবীদের প্রবেশ-প্রস্থান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সাথে অসাধু বনকর্মীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থানীয় বনজীবীদের সমবায় সমিতির মাধ্যমে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব।
কঠোর তদারকি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণই পারে সুন্দরবনের ঐতিহ্য রক্ষা করতে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের রাজস্ব প্রবাহকে পুনরায় স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে।