দেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ, মাদকবিরোধী অভিযান ও জনসচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য ডোপ টেস্ট সনদ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ, পেশাদার চালনা এবং কিছু ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেও মাদক শনাক্তকরণ পরীক্ষার ব্যবহার রয়েছে। এসব ব্যবস্থাকে একটি স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা গেলে মাদক প্রতিরোধে তা সহায়ক হতে পারে।
ডোপ টেস্ট হলো শরীরে নির্দিষ্ট মাদক বা নেশাজাতীয় পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত করার একটি চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। সাধারণত মূত্র, রক্ত, লালা বা চুলের নমুনা ব্যবহার করা হয়। কোন পদার্থ কতদিন পর্যন্ত শনাক্ত হতে পারে, তা মাদকের ধরন, গ্রহণের মাত্রা, ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা এবং পরীক্ষার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব ধরনের মাদক একইভাবে শনাক্ত হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
মাদক প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হয়।
চাকরিতে প্রবেশ, পেশাদার যানবাহন চালনা, বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে প্রাথমিক পরীক্ষায় কোনো পদার্থের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেই একজন ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মাদকাসক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। প্রয়োজনে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের সুযোগ থাকতে হবে।
জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো আলাদা একটি সরকারি ডোপ টেস্ট সনদ চালুর ধারণা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এমন ব্যবস্থা চালুর আগে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যের গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা, পরীক্ষার নির্ভুলতা, ফলাফলের বিরুদ্ধে আপিল এবং কারা এসব তথ্য দেখতে পারবেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন।
কারণ ডোপ টেস্টের ফল অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্য। ভুল রিপোর্ট বা তথ্য ফাঁস হলে একজন নাগরিকের চাকরি, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই কোনো সরকারি ডাটাবেজ তৈরি হলে সেখানে শক্তিশালী তথ্য-সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রয়োজন ও ঝুঁকি বিবেচনায় ডোপ টেস্ট ব্যবহারের ক্ষেত্র হতে পারে—
তবে সব নাগরিকের ওপর নির্বিচারে পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকি, প্রয়োজনীয়তা ও আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে এর ব্যবহার নির্ধারণ করাই অধিক যুক্তিসংগত।
মাদকাসক্তিকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। আসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন এবং পরিবারের সম্পৃক্ততাও মাদক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোনো ব্যক্তির পরীক্ষায় মাদকের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে তাকে শুধু শাস্তির আওতায় না এনে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডোপ টেস্টের ফল যেন হয়রানি, বৈষম্য বা সামাজিকভাবে হেয় করার হাতিয়ার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ডোপ টেস্টকে মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। কোথায় পরীক্ষা হবে, কারা পরীক্ষা পরিচালনা করবে, কোন কোন পদার্থ শনাক্ত করা হবে, ফলাফল কতদিন সংরক্ষণ করা হবে, কারা তথ্য দেখতে পারবেন এবং ভুল ফলাফলের বিরুদ্ধে কীভাবে আপিল করা যাবে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট বিধান প্রয়োজন।
মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি। সেই ব্যবস্থার একটি অংশ হতে পারে স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক পদ্ধতিতে পরিচালিত ডোপ টেস্ট।
তবে এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নাগরিককে হয়রানি করা নয়; বরং মাদক প্রতিরোধ, ঝুঁকি শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি এবং একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখা।