ম.ম.রবি ডাকুয়া, মোংলা {বাগেরহাট} প্রতিনিধি
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে ডোপ টেস্ট সনদ চালু সময়ের দাবি

দেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ, মাদকবিরোধী অভিযান ও জনসচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য ডোপ টেস্ট সনদ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ, পেশাদার চালনা এবং কিছু ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেও মাদক শনাক্তকরণ পরীক্ষার ব্যবহার রয়েছে। এসব ব্যবস্থাকে একটি স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা গেলে মাদক প্রতিরোধে তা সহায়ক হতে পারে।

ডোপ টেস্ট কী?

ডোপ টেস্ট হলো শরীরে নির্দিষ্ট মাদক বা নেশাজাতীয় পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত করার একটি চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। সাধারণত মূত্র, রক্ত, লালা বা চুলের নমুনা ব্যবহার করা হয়। কোন পদার্থ কতদিন পর্যন্ত শনাক্ত হতে পারে, তা মাদকের ধরন, গ্রহণের মাত্রা, ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা এবং পরীক্ষার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব ধরনের মাদক একইভাবে শনাক্ত হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।

কেন প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থা?

মাদক প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হয়।

চাকরিতে প্রবেশ, পেশাদার যানবাহন চালনা, বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে প্রাথমিক পরীক্ষায় কোনো পদার্থের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেই একজন ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মাদকাসক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। প্রয়োজনে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের সুযোগ থাকতে হবে।

সরকারি ডোপ টেস্ট সনদ কি চালু করা সম্ভব?

জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো আলাদা একটি সরকারি ডোপ টেস্ট সনদ চালুর ধারণা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এমন ব্যবস্থা চালুর আগে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যের গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা, পরীক্ষার নির্ভুলতা, ফলাফলের বিরুদ্ধে আপিল এবং কারা এসব তথ্য দেখতে পারবেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন।

কারণ ডোপ টেস্টের ফল অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্য। ভুল রিপোর্ট বা তথ্য ফাঁস হলে একজন নাগরিকের চাকরি, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই কোনো সরকারি ডাটাবেজ তৈরি হলে সেখানে শক্তিশালী তথ্য-সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

কোথায় ব্যবহার করা যেতে পারে?

প্রয়োজন ও ঝুঁকি বিবেচনায় ডোপ টেস্ট ব্যবহারের ক্ষেত্র হতে পারে—

  • সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে;
  • পেশাদার চালকদের ক্ষেত্রে;
  • নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগের সময়;
  • আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে;
  • খেলাধুলায় নিষিদ্ধ পদার্থ শনাক্তকরণে;
  • চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রয়োজনে;
  • আইনগত প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত নিয়ম অনুসারে।

তবে সব নাগরিকের ওপর নির্বিচারে পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকি, প্রয়োজনীয়তা ও আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে এর ব্যবহার নির্ধারণ করাই অধিক যুক্তিসংগত।

শুধু পরীক্ষা নয়, চিকিৎসাও জরুরি

মাদকাসক্তিকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। আসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন এবং পরিবারের সম্পৃক্ততাও মাদক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কোনো ব্যক্তির পরীক্ষায় মাদকের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে তাকে শুধু শাস্তির আওতায় না এনে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডোপ টেস্টের ফল যেন হয়রানি, বৈষম্য বা সামাজিকভাবে হেয় করার হাতিয়ার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রয়োজন জাতীয় নীতিমালা

ডোপ টেস্টকে মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। কোথায় পরীক্ষা হবে, কারা পরীক্ষা পরিচালনা করবে, কোন কোন পদার্থ শনাক্ত করা হবে, ফলাফল কতদিন সংরক্ষণ করা হবে, কারা তথ্য দেখতে পারবেন এবং ভুল ফলাফলের বিরুদ্ধে কীভাবে আপিল করা যাবে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট বিধান প্রয়োজন।

মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি। সেই ব্যবস্থার একটি অংশ হতে পারে স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক পদ্ধতিতে পরিচালিত ডোপ টেস্ট।

তবে এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নাগরিককে হয়রানি করা নয়; বরং মাদক প্রতিরোধ, ঝুঁকি শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি এবং একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখা।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভায় বিট পুলিশিং ও উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত

১

উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করলে কাউকেই ছাড় নয়: জৈন্তাপুর উপজেলা জাসাস সাধারণ সম্পাদকের হুঁশিয়ারি

২

মঘাদিয়া শ্রমিক দলের কাউন্সিলে বাবুল মিয়া সভাপতি, সাইদুল ইসলাম রানা যুগ্ম সভাপতি

৩

ঈশ্বরগঞ্জে পুলিশের ২৪ ঘণ্টার অভিযানে গ্রেপ্তার ১০

৪

ছয় তলা থেকে লাফ দেওয়া ড্যাফোডিল শিক্ষার্থী ইবনাতের আইসিইউতে মৃত্যু

৫

রোবোটিক সার্জারিতে নতুন অধ্যায়, প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেন গাজী মিজান

৬

ন্যায্য বাজার বিডি’ সদস্য কার্ড নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি অনুমোদনের তথ্য যাচাইয়ের দাবি

৭

নবীনগরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

৮

মান্দায় ১১ উপজেলার সাংবাদিকদের পরিচিতি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

৯

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

১০

অনলাইন জুয়া বিরোধী অভিযানে ঈশ্বরগঞ্জে যুবক গ্রেপ্তার

১১

তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সাফল্য, ইতালির রোমে যাচ্ছে ‘স্বাস্থ্য বন্ধু’

১২

মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে ডোপ টেস্ট সনদ চালু সময়ের দাবি

১৩

শ্রমিক জনতার দলের আত্মপ্রকাশ, ঘোষণা কেন্দ্রীয় কমিটি

১৪

রাজশাহীতে সোনার বার সহ গ্রেপ্তার ২

১৫

১০ টাকার টিকিটে হাজার টাকার পরীক্ষা: খুমেক হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক বাণিজ্যের অভিযোগ

১৬

জৈন্তাপুর পৌরসভা ঘোষণার মাধ্যমে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ঘোষণা: মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী

১৭

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে মতবিনিময় ও সাংগঠনিক সভা

১৮

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাষ্ট্রালাপ পাঠচক্র’-এর ৯ম আসর অনুষ্ঠিত।

১৯

বিনয়বাঁশী জলদাসের ১১৫তম জন্মদিবস উপলক্ষে চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও দায়িত্ব বণ্টন সভা

২০