কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালকদের টার্গেট করে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর চাঞ্চল্যকর রহস্য উন্মোচন করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এ ঘটনায় আন্তঃজেলা ছিনতাই চক্রের মূলহোতা এবং ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে পরিচিত আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ জানায়, গত ১২ আগস্ট নাঙ্গলকোট উপজেলার আতিয়াবাড়ী এলাকা থেকে একটি অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতের পরিচয় শনাক্তের পর জানা যায়, তিনি ১৮ বছর বয়সী অটোরিকশাচালক মো. মেহেদী। এ ঘটনায় নাঙ্গলকোট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হওয়ার পর পুলিশ সুপার মোতার নির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ছায়া তদন্ত শুরু করে।
পরে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মূল অভিযুক্ত আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিকসহ শাহেদ, ফাহিম ও সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা মেহেদীকে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে মানিক ও সেলিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন।
তদন্তের গভীরে গিয়ে পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত মানিকের হেফাজত থেকে একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ফোনটি গত ২৪ জুলাই নিখোঁজ হওয়া ১৫ বছর বয়সী কিশোর অটোরিকশাচালক মো. আরমান হোসেনের। আরমানের নিখোঁজের ঘটনায় পূর্বে একটি অপহরণ মামলা হয়েছিল। এই সূত্র ধরে অটোরিকশার বিভিন্ন অংশ উদ্ধারসহ মোড় জোবায়ের হোসেন সুজন, নূর আলম ও গিয়াস উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তীতে মানিক ও সেলিমকে রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা স্বীকার করেন যে, আরমানকে হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে মনোহরগঞ্জের বিনয়ঘর এলাকার একটি ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। গত ১২ সেপ্টেম্বর সেখান থেকেই একটি অজ্ঞাত কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছিল। এই ঘটনায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর মানিক আদালতে স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর লাকসাম উপজেলায় ১৭ বছর বয়সী অপর এক কিশোর অটোরিকশাচালক শাহজাহান সাইমনকে একইভাবে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছিল। সে সময় হত্যার পর সাইমনের মরদেহ একটি পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে ফেলে রাখা হয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মানিককে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি সাইমনকে হত্যার কথাও আদালতে স্বীকার করেছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিক মূলত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের জন্য ঠান্ডা মাথায় চালকদের নিশানা করতেন এবং ছিনতাই নিশ্চিত করতে সুকৌশলে তাদের জীবন কেড়ে নিতেন।
চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাগুলোর মূল রহস্য উন্মোচন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধচক্রের মূলোৎপাটনে তদন্ত ও অভিযান চলমান রয়েছে।