পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান এলাকায় কয়েক দশক আগে তেল অনুসন্ধানের জন্য খনন করা কূপ আজও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় ৩৮ বছর ধরে বন্ধ থাকা এই প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সেই সময়কার অনুসন্ধানের ফলাফল কি বর্তমান প্রযুক্তিতে পুনরায় যাচাই করা সম্ভব?
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে উত্তরাঞ্চলে ভূতাত্ত্বিক/ভূকম্পন জরিপের মাধ্যমে শালবাহান এলাকায় হাইড্রোকার্বনের সম্ভাবনা শনাক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তৎকালীন সরকার শালবাহান প্রকল্পে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সেখানে খনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বলেও একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে উদ্বোধনের সঠিক তারিখ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অসঙ্গতি রয়েছে—কোথাও ১০ এপ্রিল, আবার কোথাও ১০ মে ১৯৮৮ উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সরকারি নথি ছাড়া নির্দিষ্ট তারিখকে চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না।
তৎকালীন অনুসন্ধানে প্রায় ৮ হাজার ফুট গভীরতায় তেলের সম্ভাবনার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং কূপগুলো সিল করে দেওয়া হয় বলে সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে কেন প্রকল্পটি বন্ধ হয়েছিল—এর নির্ভরযোগ্য সরকারি ব্যাখ্যা সহজলভ্য নয়।
‘তেল ছিল’—নাকি আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন?
শালবাহানকে নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পুরোনো অনুসন্ধানের তথ্যকে সরাসরি “বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেলের বিশাল মজুত নিশ্চিত” বলা যায় না। বর্তমান প্রযুক্তিতে নতুন করে ভূতাত্ত্বিক ও ভূকম্পন জরিপ, পুরোনো কূপের তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন হলে নতুন অনুসন্ধান কূপ খননের মাধ্যমে বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে তেঁতুলিয়ায় স্থানীয় নাগরিকদের উদ্যোগে শালবাহান তেলকূপ পুনরায় চালু ও বন্ধ হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের দাবিতে মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় সাম্প্রতিক সময়ে বড় আকারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ।
তবে এই আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে শালবাহান কূপ বন্ধ থাকার মধ্যে কোনো যোগসূত্র বা ‘আমদানি সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্র’ রয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে ভারত বা অন্য কোনো দেশের চাপের কারণে প্রকল্পটি বন্ধ হয়েছিল—এ দাবিরও নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ অনুসন্ধান
তাই শালবাহান নিয়ে গুজব বা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নয়, বরং সরকারি নথি প্রকাশ, পুরোনো অনুসন্ধান প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিতে পুনরায় সম্ভাব্যতা যাচাই করাই হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মনে হলে আধুনিক 3D seismic survey ও অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে সেখানে বর্তমানে কোনো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেল বা গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা যেতে পারে।
৩৮ বছর ধরে পড়ে থাকা শালবাহান কূপের প্রকৃত ইতিহাস ও ভূগর্ভস্থ সম্পদের সম্ভাবনা—গুজবে নয়, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানেই পরিষ্কার হওয়া উচিত।
তথ্য যাচাই: প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে।