নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) তৃতীয় সমাবর্তনের নিবন্ধন ফি আগের দুই সমাবর্তন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেশি নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, সমাবর্তনের ফি যৌক্তিক পর্যায়ে কমানো হোক, যাতে আর্থিক সংকটের কারণে কেউ এই আয়োজন থেকে বঞ্চিত না হন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. তামজিদ হোসাইন চৌধুরী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে তৃতীয় সমাবর্তনের নিবন্ধন ফি ও নিবন্ধনের সময়সীমা ঘোষণা করা হয়।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা (আইআইটি ও আইআইএস) এবং প্রফেশনাল মাস্টার্স (আইআইএস) ডিগ্রি বা প্রোগ্রামের জন্য নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার টাকা। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর অথবা সংশ্লিষ্ট ডিপ্লোমা ও প্রফেশনাল মাস্টার্সের দুটি ডিগ্রি একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হলে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের সমাবর্তনগুলোর ফির সঙ্গে তুলনা করে শিক্ষার্থীরা বলছেন, এবার নিবন্ধন ফি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রথম সমাবর্তনে শুধু স্নাতক ডিগ্রির জন্য নিবন্ধন ফি ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য ছিল ৩ হাজার টাকা। দ্বিতীয় সমাবর্তনে এ ফি বেড়ে যথাক্রমে ৩ হাজার ৫০০ ও ৪ হাজার ৫০০ টাকা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম সমাবর্তনে ব্যাংক চার্জসহ মূল সনদ ও নিবন্ধন ফি বাবদ মোট ৩ হাজার ৩২০ টাকা নেওয়ার উদাহরণ টেনে শিক্ষার্থীরা নোবিপ্রবির নির্ধারিত ফি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের ফির সঙ্গেও নোবিপ্রবির ফি তুলনা করছেন তাঁরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ সমাবর্তনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য নিবন্ধন ফি ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং উভয় ডিগ্রির জন্য একসঙ্গে ৪ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য ফি ছিল ৩ হাজার টাকা। পিএইচডি ও এমফিল ডিগ্রির ক্ষেত্রে এ ফি ছিল ৫ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অষ্টম সমাবর্তনে স্নাতক পর্যায়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা, স্নাতকোত্তরে ২ হাজার টাকা এবং পিএইচডি পর্যায়ে ৪ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ সমাবর্তনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য ফি ছিল ৩ হাজার টাকা এবং দুটি ডিগ্রির জন্য একসঙ্গে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী ২৩ জানুয়ারি ২০২৭ অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় সমাবর্তনের নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার টাকা।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন। তবে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা এককালীন ব্যয় বহন করা কঠিন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদ্য স্নাতকদের ক্ষেত্রে এ ব্যয় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সদ্য স্নাতকদের জন্য ফি বহন কঠিন
ফি নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (বিজিই) বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জাহেদুল হক বলেন, তাঁর ডিফেন্স শেষ হলেও এখনো ফল প্রকাশিত হয়নি। সমাবর্তনের আগে ফল প্রকাশিত হলে সদ্য স্নাতক হিসেবে এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, “সদ্য গ্র্যাজুয়েট হয়ে সমাবর্তন পাওয়াটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু সমাবর্তনের যে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা সদ্য গ্র্যাজুয়েটদের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য।
গ্র্যাজুয়েট হলে পুরো পরিবার তাকিয়ে থাকে, কখন তাদের ছেলে চাকরি পাবে, কাজ করবে। সেখানে পরিবারের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা এনে সমাবর্তনে অংশ নেওয়া একটা বোঝাস্বরূপ।”
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নোবিপ্রবিতেও ফি কমানোর বিষয়টি প্রশাসনের বিবেচনা করা উচিত।
একই দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাজিদ ইবনে জামাল ফয়সাল।
তিনি বলেন, “আমার মতো অনেক সদ্য গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত ও আবেগঘন মুহূর্ত সমাবর্তন, যা দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও স্বপ্ন পূরণের স্বীকৃতি বহন করে। কিন্তু সমাবর্তনের ফি ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করায় অনেক সদ্য গ্র্যাজুয়েটের জন্য এই বিশেষ মুহূর্তের অংশ হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের এই সময়ে অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে এত বড় অঙ্কের টাকা বহন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেন কেউ সমাবর্তন থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ফি যৌক্তিকভাবে কমানোর দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা।
ফি নির্ধারণের পক্ষে উপাচার্যের ব্যাখ্যা
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, সাত বছর আগেও সমাবর্তনের ফি ৩ হাজার ৫০০ টাকা ছিল। সময়ের সঙ্গে সবকিছুর দাম বেড়েছে। সার্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এবারের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নোবিপ্রবি ঢাকায় অবস্থিত না হওয়ায় সমাবর্তনের আয়োজনের জন্য ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাইরে থেকে আনতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উপহার দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে, যার জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে।
উপাচার্যের ভাষ্য, সমাবর্তন আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো আয় করছে না। বরং নির্ধারিত নিবন্ধন ফি থেকে পাওয়া অর্থের চেয়ে আয়োজনের প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি হবে। অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সমাবর্তন আয়োজনের চেষ্টা করছে প্রশাসন।
উল্লেখ্য, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় সমাবর্তন আগামী ২৪ জানুয়ারি ২০২৭ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।