৭ দিন ধরে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হতে পারেননি ঢাকার অটোচালক মোহাম্মদ সিরাজ। আর তাতেই শেরপুরে থাকা তাঁর পুরো পরিবারের না খেয়ে থাকার উপক্রম তৈরি হয়েছে! এটি কোনো সিনেমার নাটকীয় গল্প নয়, ঢাকার বুকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে থাকা এক সাধারণ মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তব চিত্র। আর সিরাজের এই করুণ আকুতির ভেতরেই জড়িয়ে আছে দেশের প্রায় ৮০ লাখ পরিবারের আর্তনাদ।
আবেগপ্লুত কণ্ঠে সিরাজ বলছিলেন, “বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছি না। অনেক দেনা হয়ে গেছে। পোলার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এই অটো চালাইয়াই ৪ ডা ডালভাত খাইতে পারতাছি। এখন এই অটো বন্ধ হইয়া গেলে আমরা না খাইয়া থাকমু।”
সমস্যার মূলে হাত দিচ্ছে না কেউ
রাজধানীর যানজট নিরসনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের হাঁকডাক জোরদার হলেও আসল সত্য আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—রাস্তায় হুট করে এত অটোরিকশা এলো কোথা থেকে?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে, যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই চলে প্রায় ২০ লাখ। এসব যানবাহন তো আর আকাশ থেকে পড়েনি! চট্টগ্রাম পোর্ট দিয়ে চীন থেকে ব্যাটারি, মোটর ও কন্ট্রোলার আমদানি হচ্ছে প্রকাশ্যে। খুলনা, যশোর ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কারখানায় প্রতিদিন হাজার হাজার অটোরিকশা তৈরি হচ্ছে এবং শোরুম থেকে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আমদানি, উৎপাদন ও শোরুমে বিক্রির সময় সরকার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়—সবার কাছেই এগুলো বৈধ। কিন্তু যখন সিরাজের মতো প্রান্তিক মানুষ ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা ঋণ করে পেটের দায়ে সেই গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামেন, তখনই তিনি হয়ে যান ‘অবৈধ’।
বাজার বিশ্লেষক ও পথচারীদের মতে, এই নীতি অনেকটাই মাদক বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযানে পাইকারি বিক্রেতাকে ছাড় দিয়ে কেবল খুচরা ক্রেতাকে ধরার মতো। মূল সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহের উৎস বন্ধ না করে কেবল রাস্তায় দরিদ্র চালকদের ওপর কঠোর হয়ে কখনোই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
পরিবহন ও শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প কর্মসংস্থান বা সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া হুট করে অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা যৌক্তিক নয়।
১. পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদীউজ্জামান বলেন: “রাস্তার অটো একবারে বাতিল না করে মাত্র ২০-২৫ হাজার টাকা খরচে প্রযুক্তির মাধ্যমে এটাকে নিরাপদ করা সম্ভব। এলাকাভিত্তিক সংখ্যা নির্ধারণ করুন, নির্দিষ্ট জোন ভাগ করে দিন এবং চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্সের আওতায় নিয়ে আসুন।”
২. শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ জানান: “সংবিধান অনুযায়ী কাজের অধিকার ও জীবনধারণের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে অটো নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই। এটি বন্ধ করলে চালকের জীবিকা, সন্তানের শিক্ষা ও পরিবারের চিকিৎসার মৌলিক অধিকার সরাসরি লঙ্ঘিত হয়।”
ফোনের ওপাশ থেকে সিরাজের ছোট ছেলে রায়হান যখন আকুতি জানিয়ে বলে—”আব্বু, আমার জন্য একটা খেলনা গাড়ি আনবা?”—তখন কেবল একটি খেলনা নয়, বরং একটি পরিবারের দুবেলা ডাল-ভাতের সংস্থানও আটকে থাকে সেই ব্যাটারি অটোরিকশার চাকার ওপর।
নীতি নির্ধারকদের কাছে এখন সাধারণ মানুষের বড় প্রশ্ন—সিরাজের মতো লাখো মানুষের রিকশা জব্দ করে কি সত্যিই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রাইভেটকারের যানজট কমবে? নাকি মফস্বল থেকে আসা হাজারো পরিবার পথে বসবে? গাছের আগায় পানি না ঢেলে গোড়ায় হাত দেওয়া এবং আমদানির মূল উৎস নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সময়ের দাবি।