খুলনার দাকোপ উপজেলার ভদ্রা নদীর ওপর নির্মিত ভদ্রা সেতু চালু হওয়ায় দীর্ঘদিনের ফেরি ও নৌকা নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। তবে সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়ে গেছে। ফলে সেতুটি ঘিরে মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হলেও যোগাযোগব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলার ৬ নম্বর কামারখোলা ইউনিয়নের কালিনগর বাজার ও শিংজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন ভদ্রা নদীর ওপর নির্মিত এ সেতুটি স্থানীয়ভাবে কালিনগর ব্রিজ নামেও পরিচিত। প্রায় ৬৬১ দশমিক ৬৯ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রাথমিক দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে এর নির্মাণব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিল PTSEL Maitri (Pvt) Ltd।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন হয়নি। দীর্ঘ বিলম্বের পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে সেতুটি দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এখনো হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দাকোপের বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের মানুষের উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। পাশাপাশি দাকোপ, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ, বাজুয়া ও বানীশান্তা ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতেও সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ঢাকা ট্রিবিউনের তথ্য অনুযায়ী, সেতুটির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের যোগাযোগসংক্রান্ত দুর্ভোগ কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদী পারাপারের জন্য নৌকা ও ফেরির ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে সেতুটি তাই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সেতুটি চালু হওয়ায় স্থানীয় কৃষিপণ্য ও মৎস্য পরিবহনে সুবিধা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চিংড়ি, সবজি ও মুরগি পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় ও খরচ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। মোংলা বন্দরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে দেওয়া তথ্যে পরিবহন ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হার নির্দিষ্ট কোনো জরিপের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সেতু নির্মাণের আগে নদী পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়দের ভোগান্তি পোহাতে হতো। সেতুটি চালু হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে যাতায়াত সহজ হয়েছে। আগে যেখানে নদী পারাপারসহ দীর্ঘ সময় ব্যয় হতো, সেখানে এখন তুলনামূলক কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সেতুটির পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করতে আশপাশের সড়ক ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামোরও উন্নয়ন করা হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সেতুটি চালু হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। প্রাথমিকভাবে ৩৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে ৫০ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা বেড়েছে।
কেন নির্মাণকাজ শেষ করতে এত দীর্ঘ সময় লেগেছে এবং ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কী কারণ ছিল, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। নির্মাণে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
সেতুটি চালু হলেও দুই পাশের সংযোগ সড়কের অবস্থা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ রয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু অংশ এখনো মাটির রাস্তা হিসেবে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব সড়কে কাদা সৃষ্টি হলে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে ভোগান্তি বাড়তে পারে। আশপাশের বসতবাড়ি ও ঘেরের কারণে কোথাও কোথাও সড়ক প্রশস্ত করার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কালিনগরের পাশের গ্রাম জয়নগরসহ আশপাশের জনপদের মানুষের জন্য বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় আইলার পর বেড়িবাঁধ ভেঙে এসব এলাকায় একাধিকবার প্লাবনের ঘটনা ঘটেছে। ভদ্রা ও ঢাকি নদীর তীরবর্তী বেড়িবাঁধের দুর্বল অংশগুলো সংস্কার ও টেকসই করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
জয়নগর, রাজনগর ও ফকিরডাঙা এলাকায় জোয়ারের পানি প্রবেশ ও প্লাবনের ঝুঁকি সম্পর্কেও উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। তবে এসব এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি, বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ এবং সাম্প্রতিক প্লাবনের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সেতুটির আলো, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও রেলিংয়ের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও মরিচা ধরেছে কি না, আলোকসজ্জা সচল আছে কি না এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করছে কি না, তা সরেজমিনে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সেতুটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি দুই পাশের সংযোগ সড়ক পাকা করা, প্রয়োজনীয় স্থানে সড়ক প্রশস্ত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কারে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভদ্রা সেতু চালু হওয়ায় দাকোপের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সেতুর সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শুধু নদীর ওপর সেতু নির্মাণই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন উন্নত সংযোগ সড়ক, নিরাপদ বেড়িবাঁধ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সেতুটির সুফল আরও বিস্তৃত হবে।