বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে পরিবারপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হলে অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। তবে ভোটারসংখ্যা ও পরিবারসংখ্যাকে এক করে দেখার কারণে কর্মসূচিটির সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির প্রায় ৩ কোটি ৭৯ লাখ ভোটারের প্রত্যেককে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার হিসাব তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনা ভোটারপ্রতি অর্থ দেওয়ার নয়, বরং পরিবারভিত্তিক সহায়তার উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
একটি পরিবারে একাধিক ভোটার থাকলেও পরিবারপ্রতি একটি কার্ড দেওয়া হলে ব্যয়ের হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। ফলে শুধু কোনো দলের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা দিয়ে এই কর্মসূচির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা যুক্তিসংগত নয়।
পরিবারপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব ধরে সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি হিসাব নিচে তুলে ধরা হলো।
এই হিসাব অনুযায়ী, ৪ কোটি পরিবারকে নিয়মিত মাসিক সহায়তা দিতে হলে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। তবে বাস্তবে কতটি পরিবার এই সুবিধা পাবে, কত টাকা বরাদ্দ থাকবে এবং কীভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত নীতিমালা ও বাজেটের ওপর।
এত বড় কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারি বাজেট, বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সমন্বয়, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং অপচয় কমানোর মতো বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলো একীভূত করলেই পুরো ব্যয়ের অর্থ পাওয়া যাবে, এমনটি নিশ্চিত নয়। বরং সম্ভাব্য আয়, সাশ্রয় এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
পর্যায়ক্রমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হলে একসঙ্গে পুরো অর্থের প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিপুলসংখ্যক পরিবারকে সহায়তা দিতে হলে টেকসই অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মসূচিটির আওতায় কারা সুবিধা পাবেন, তা নিয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য নীতিমালা থাকা জরুরি। পরিবারের আয়, আর্থিক অবস্থা, সদস্যসংখ্যা এবং অন্যান্য সরকারি সহায়তা পাওয়ার তথ্য বিবেচনায় নিয়ে উপকারভোগী নির্বাচন করা হলে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত পরিবারকে চিহ্নিত করা সহজ হবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়া বা প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দেওয়ার ঝুঁকি এড়াতে ডিজিটাল ডেটাবেজ, স্বচ্ছ তালিকা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, ফ্যামিলি কার্ড না পেলে অন্য দলের সমর্থকেরা ভ্যাট-ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দিলে কী হবে। তবে এটি বাস্তব অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়ে একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি হিসেবেই বিবেচ্য।
কর ও ভ্যাট আদায় রাষ্ট্রের আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কোনো নির্দিষ্ট সরকারি সুবিধা না পাওয়ার কারণে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিম্নআয়ের পরিবারের জীবনযাত্রায় সহায়তা করতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচন, অর্থের জোগান, নিয়মিত অর্থ বিতরণ এবং জবাবদিহির ওপর।
এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে: প্রকৃত উপকারভোগী কারা হবেন? অর্থের স্থায়ী উৎস কী? রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে তালিকা তৈরি হবে কীভাবে? অনিয়মের অভিযোগ উঠলে প্রতিকার পাওয়া যাবে কোথায়?