খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের নলিয়ান গ্রাম। এক পাশে শিবসা নদী, অন্য পাশে সুন্দরবন। লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই দুর্গম জনপদে ছয় দশক আগে শিক্ষার যে আলো জ্বলে উঠেছিল, তার নাম নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
১৯৬৭ সালে মাত্র ৯ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক নিয়ে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু। বেড়িবাঁধের ওপর পোস্ট অফিসের অর্ধেক ঘরে চলত পাঠদান। টিনের চাল, গোলপাতার বেড়া আর কাদামাটির মেঝে ছিল শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা।
বিদ্যালয়ের জন্য জমি দেন স্থানীয় ফকির ও সরদার পরিবারের সদস্যরা। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন গহর আলী ফকির এবং সদস্য সচিব শৈলেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন মান্দার আলী ফকির, উজির আলী সরদার ও নূর আলী সরদারসহ স্থানীয়রা।
অর্থের সংকট ছিল চরম। বিদ্যালয় চালাতে গ্রামের মা-বোনেরা প্রতিদিন রান্নার আগে এক মুষ্টি করে চাল আলাদা করে রাখতেন। সেই চাল ও ধান বিক্রির অর্থেই চলত বিদ্যালয়ের নানা প্রয়োজন। অন্যদিকে সুন্দরবন থেকে কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহ করে গ্রামবাসী নিজেদের শ্রমে নির্মাণ করেছিলেন বিদ্যালয়ের ঘর।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষার্থী মুন্সুর আলী এখনো সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় শিবসা নদীর পানিতে বিদ্যালয়ের ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যায়।
তবে থেমে থাকেননি স্থানীয়রা। আঃ খালেক গাজী ও প্রকাশ চন্দ্র মন্ডলসহ এলাকার মানুষের নেতৃত্বে আবারও বাড়ি বাড়ি ধান সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয়দের উদ্যোগ ও শ্রমে পুনর্নির্মাণ করা হয় বিদ্যালয়।
বিদ্যালয়টির দীর্ঘ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন প্রধান শিক্ষক সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, যিনি প্রায় ৩০ বছর প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব সামলেছেন। সাবেক শিক্ষক ভবেন্দ্রনাথ মন্ডল, আব্দুল্লাহ ফকির, শাহাবুদ্দিন গাজী ও আশুতোষ মন্ডলসহ অনেক শিক্ষকও এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৯৭৭ সালে বিদ্যালয়টির প্রথম এসএসসি ব্যাচ পরীক্ষায় অংশ নেয়। মাত্র দুই শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই উত্তীর্ণ হন। তাঁরা হলেন আব্দুল গফুর সানা ও প্রকাশ চন্দ্র মন্ডল।
১৯৮২ সালে বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়। প্রথম ব্যাচে প্রথম বিভাগ অর্জন করেন এফ এম আব্দুল হাই।
ছয় দশকের পথচলায় এই বিদ্যালয় থেকে বের হয়েছেন শিক্ষক, অধ্যাপক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার ও জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।
দুর্যোগপ্রবণ শিবসা পাড়ের মানুষের কাছে তাই নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি তাঁদের দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও স্বপ্নের প্রতীক।
স্থানীয়দের দাবি, ৬০ বছরের পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে সরকারি উদ্যোগে মডেল স্কুলে রূপান্তর করা হোক।
শিবসা পাড়ের মানুষের হাতে মুষ্টিমুষ্টি চাল দিয়ে যে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল, সেটি আরও উজ্জ্বল করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রত্যাশা তাঁদের।